kalerkantho

মহাহিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়

দুর্নীতির ৩৩ উৎস দেখাল দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুর্নীতির ৩৩ উৎস দেখাল দুদক

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহাহিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভুয়া পেনশনসংক্রান্ত বিল ও ভুয়া ভ্রমণ ভাতা বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্নভাবে লাগামহীন দুর্নীতি করে যাচ্ছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের এ রকম ৩৩টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি এই দুর্নীতি প্রতিরোধে ২১টি সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান গতকাল সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক দলের তৈরি প্রতিবেদনটি অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।

দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান বলেন, দুদক দলের প্রতিবেদনে মোটা দাগে ৩৩টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তা নিরসনে ২১ দফা সুপারিশ রয়েছে। অর্থমন্ত্রী দুদকের এই কার্যক্রমকে স্বাগত জানান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কমকর্তা-কর্মচারীকে দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

দুর্নীতির উৎস

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলিজনিত কারণে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করার পর হিসাবরক্ষণ দপ্তর থেকে বেতনপত্র (এলপিসি) নতুন কর্মস্থলে পাঠাতে দেরি হয়ে থাকে। আর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরে যাওয়ার সময় শেষ বেতনপত্র (ইএলপিসি) ইস্যুর ক্ষেত্রে চরম

 ভোগান্তির শিকার হন। সার্ভিস স্টেটমেন্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হতে হয়। আর সার্ভিস বুক ভেরিফিকেশন টাকার বিনিময়ে করা হয়ে থাকে। সিলেকশন গ্রেড-টাইম স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময় এবং বেতন নির্ধারণের পর এরিয়ার বিল দাখিল করা হলেও অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে। পে-ফিক্সেশনের বেলায়ও চলে দুর্নীতি। ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ) হিসাব খোলার সময় অর্থ দিতে হয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এমনকি জিপিএফ অগ্রিমের অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন না হলে সুবিধা পান না এবং চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের বেলায়ও দুর্নীতির শিকার হন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সরকারি বিভিন্ন অগ্রিম যেমন—গৃহ নির্মাণ, গাড়ি, মোটরসাইকেল, কম্পিউটার ইত্যাদির বিলের টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রেও অর্থ আদায় হয়ে থাকে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকসহ কর্মচারীদের পেনশন পেতেও ঘুষ দিতে হয়; ভ্রমণ ভাতার বিল পরিশোধের জন্য এবং আনুষঙ্গিক ও অন্যান্য খাতের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে অনিয়মিত অর্থ প্রদান করতে হয়। এমনকি বিনোদন ভাতার বিল উত্তোলনের বেলায়ও চলে অনিয়ম, বিল দাখিলের ক্ষেত্রে টোকেন প্রদানের সময় হয়রানির শিকার হতে হয়।

আর সরকারি চাকরিতে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রথম বেতন বিলের টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে চলে উেকাচ আদায়। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের ক্ষেত্রে চলে ভয়ংকর দুর্নীতি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কেনাকাটার সময় বিভিন্ন অনিয়মের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রি-অডিট আপত্তি প্রদান না করে অর্থের বিনিময়ে বিল পাস করে থাকে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর কর্তৃক সম্পদ সংগ্রহ বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট-আইটি ও কাস্টমস ডিউটি না কেটেই সরকারি রাজস্ব আদায়ে প্রতিবন্ধকতা বা বাধা সৃষ্টি করা হয় এবং রাজস্ব আদায়ের টার্গেটে পৌঁছতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।

উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা, হয়রানি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। জুন মাসে যথাযথ প্রি-অডিট না করেই আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিল পাস করা হচ্ছে। সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে মাস ভিত্তিতে সমরূপে ব্যয় না করে অর্থবছরের শেষে গিয়ে এপ্রিল-মে-জুন মাসে অর্থ ছাড় করা হয় ও বিল সাবমিট করা হয় এবং হিসাব দপ্তরগুলো যথাযথ প্রি-অডিট না করে বিলগুলো পাস করে কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নেয়। পে-রোলে নেই এমন ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেও সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। কখনো কখনো ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থের ক্ষতি ও আত্মসাৎ করা হচ্ছে। নিয়মিত বিলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয় না, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বেতন-ভাতা পরিশোধের নির্দেশনা অমান্য করে সরকারি সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির পাশপাশি বরাদ্দ জটিলতা দেখানো এবং বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ নেই বলে বিলম্ব করা ও ভোগান্তি সৃষ্টি করা হয়। আর দাখিলকৃত কাগজপত্র সঠিক ও পর্যাপ্ত নয় বলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়।

ব্যাংকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে অ্যাডভাইস প্রদান না করা, কিংবা ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি টাকা দিলেই অ্যাডভাইস পাঠানো এবং সঠিক বরাদ্দ পাওয়ার পরও অর্থনৈতিক কোড নিয়ে বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি সৃষ্টি করা হয় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে।

মন্তব্য