kalerkantho

হাসিনা-মোদি ভিডিও কনফারেন্স

এই অঞ্চল থেকে সন্ত্রাস দূর করার অঙ্গীকার

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা ও বিশেষ প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি    

১২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এই অঞ্চল থেকে সন্ত্রাস দূর করার অঙ্গীকার

গতকাল ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : বাসস

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আগামী পাঁচ বছরে আরো এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘বিশ্বে একটি রোল মডেল’ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতেও এ সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে।’

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক জোরদারে শেখ হাসিনার অবদানের কথা উল্লেখ করে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন,  ‘গত পাঁচ বছরে আমরা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ের জন্য কাজ করতে পেরেছি। আমার বিশ্বাস, আগামী পাঁচ বছরে এই সম্পর্ক আরো অনেক এগিয়ে যাবে।’ 

গতকাল সোমবার দুপুরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশে চারটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দুই প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে এবং নরেন্দ্র মোদি নয়াদিল্লি থেকে এই ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে ঢাকা থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও নয়াদিল্লি থেকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বক্তব্য দেন। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, হাইকমিশনার ও কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ‘পাকিস্তানি’ সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এই অঞ্চল থেকে সন্ত্রাস দূর করার অঙ্গীকার করেছেন শেখ হাসিনা। ভারতে আসন্ন নির্বাচনের জন্য নরেন্দ্র মোদিকে শুভ কামনা জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা ও নিহতদের পরিবারগুলোকে সমবেদনা জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে বিশাল ও ঐতিহাসিক জয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান নরেন্দ্র মোদি।

ভিডিও কনফারেন্সে চারটি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে ভারত থেকে দোতলা বাস, একতলা এসি ও নন-এসি বাস এবং ট্রাক আমদানি; ভারতীয় আর্থিক অনুদানে পাঁচ জেলায় (জামালপুর, শেরপুর, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন; ভারতীয় অনুদানে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ায় ১১টি পানি শোধনাগার স্থাপন এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোতে ভারতের ন্যাশনাল নলেজ নেটওয়ার্ক (এনকেএন) সম্প্রসারণের আওতায় বাংলাদেশে ওই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বিগত এক দশকে উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রথাগত খাত যেমন—নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু ও পরিবেশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জনযোগাযোগ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতে সহযোগিতা প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।’

এর পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন ও অপ্রচলিত খাত যেমন—ব্লু ইকোনমি এবং মেরিটাইম, পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ গবেষণা, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ রপ্তানি এবং সাইবার সিকিউরিটি খাতেও দুই দেশ সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে তাঁর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি পোষণ করে এবং কোনো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে কখনো বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় প্রদান করা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘দ্বিক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের এ অঞ্চল এবং এর বাইরে সন্ত্রাসবাদ দূর করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, গতকাল বাংলাদেশি বেশ কজন তরুণ সংসদ সদস্য ও নেতার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সম্পর্ক আত্মীয়তার।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ভারতের জন্য আনন্দের ও অনুপ্রেরণার কারণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য অনেক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঠিক করেছেন। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো উদ্বোধন করে তিনি বলেন, এসব প্রকল্পই সরাসরি জনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের জীবন মান উন্নয়নে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকার প্রতিফলন ঘটেছে।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, পানি শোধনাগারের মাধ্যমে কয়েক হাজার পরিবার বিশুদ্ধ পানি পাবে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ লোক সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাবে। ভারতের সরবরাহ করা বাস ও ট্রাক বাংলাদেশি গণপরিবহনে আরো সহায়ক হবে। এ ছাড়া ভারতের ন্যাশনাল নলেজ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারতসহ সারা বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কানেক্টিভিটি (যোগাযোগ) বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় প্রেরণা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এটি তাঁর ষষ্ঠ ভিডিও কনফারেন্স। দুই দেশের নেতাদের মধ্যে এত ঘন ঘন আলোচনা, যোগাযোগ থেকে বোঝা যায় এই সম্পর্ক কতটা গভীর ও শক্তিশালী।

এবারের ভিডিও কনফারেন্সে দুই দেশের নির্বাচন নিয়ে দুজনের বক্তব্য ও শুভ কামনার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। এক দিন আগেই গত রবিবার ভারতের লোকসভা নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। সাত ধাপে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে প্রথম ধাপের ভোট হবে আগামী ১১ এপ্রিল। পুরো ভিডিও কনফারেন্সে দুই প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক ভাষা ছিল খুব আন্তরিক। নরেন্দ্র মোদি যখন কথা বলছিলেন তখন শেখ হাসিনার মুখে ছিল সহজ এক হাসি। আবার সুষমা যখন বললেন, প্রতিবেশী প্রথম, কিন্তু তাদের মধ্যেও সবার প্রথম হলো বাংলাদেশ—এ কথার মধ্যে সুষমাও বুঝিয়ে দিলেন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের উচ্চতা।

মন্তব্য