kalerkantho

‘সঙ্কট মুক্তির একমাত্র পথ’

আজাদুর রহমান চন্দন   

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘সঙ্কট মুক্তির একমাত্র পথ’

‘বাংলাদেশের সংগ্রামী জনসাধারণ এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করিয়াছেন যে বাঙালীকে আর শোষিত ও অবদমিত রাখা যাইবে না। গত রবিবার (৭ মার্চ) রমনা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়াছেন, তাহাতে প্রতিফলিত হইয়াছে মুক্তিপাগল প্রতিটি বাঙালীর মনোভাব। পূর্ব বাংলার মাটি হইতে এখনো শহীদের রক্তের দাগ মুছিয়া যায় নাই, এখনো এ দেশের বহু ঘরে শোনা যাইতেছে স্বজন-হারানোর আর্তনাদ। তাই শেখ মুজিবুর রহমান প্রদীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছেন যে, তিনি শহীদের রক্ত মাড়াইয়া পরিষদে যোগ দিতে পারেন না। তবে তিনি পরিষদে যোগদানের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়াইয়া দেন নাই। অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হইলে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া নিলে, গণহত্যার তদন্ত করা হইলে এবং দেশের শাসনভার জনপ্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তর করিলেই তিনি বিবেচনা করিয়া দেখিবেন পরিষদে যোগদান করিবেন কি করিবেন না। ইহার আগে পরিষদে যোগদান করার কোনো প্রশ্নই উঠে না বলিয়া তিনি জানান।’ এই মন্তব্য ছিল ৯ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে দৈনিক পাকিস্তানের।

‘সঙ্কট মুক্তির একমাত্র পথ’ শিরোনামের ওই সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়, ‘শেখ মুজিবুর রহমান পরিষদে যোগদানের প্রশ্নটি বিবেচনা করিয়া দেখার যে চারিটি শর্ত আরোপ করিয়াছেন সেগুলি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। এই শর্তাবলী মানিয়া লওয়া হইলেই শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁহার পার্টি সদস্যদের পরিষদে যোগদান করার পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হইতে পারে, ইহার আগে নয়। বেয়নেটের ছায়ায় কখনো পরিষদের কাজ মুক্ত ও সুষ্ঠুভাবে চলিতে পারে না। এই জন্যই অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা এক অপরিহার্য প্রয়োজন দেখা দিয়াছে। খোদ প্রেসিডেন্টই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলিয়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। সুতরাং এ ব্যাপারে কোন রকম বিলম্ব ঘটানোর কোন নৈতিক অধিকার বর্তমান সরকারের নাই। একথা প্রেসিডেন্টের বোঝা উচিত যে, জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পথে অন্তরায় শুরু হইতেছে বলিয়াই পূর্ব বাংলা আজ বিক্ষুব্ধ। যদি একটি সংখ্যালঘু দলের অন্যায় আবদার রক্ষা করিতে গিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হইত, তবে বাংলাদেশ ফাটিয়া পড়িত না বিক্ষোভে, শহীদের রক্তে রঞ্জিত হইত না বাংলার মাটি। বাংলাদেশের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আরম্ভের কথা ঘোষণা করিতে গিয়া তিনি গত শনিবার যে বেতার ভাষণটি দান করিয়াছেন তাহা খুবই দুঃখজনক, সন্দেহ নাই। তাঁহার সেই ভাষণ সাত কোটি বাঙালীর মনে দুঃখ ও ক্ষোভের সঞ্চার করিয়াছে। তিনি যে সুরে কথা বলিয়াছেন, তাহা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ও অস্বাভাবিক ঠেকিয়াছে। গণপ্রতিবাদমুখর বাংলার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি বাংলাদেশের জনসাধারণ ও বাঙালী নেতৃত্বকেই দায়ী করিয়াছেন। কিন্তু একটি সংখ্যালঘু দলের যে নেতাটি ইহার জন্য দায়ী, যাহার অনমনীয় মনোভাবের জন্যই বাংলার মাটি আবার রঞ্জিত হইল রক্তে, বুলেটের শিকার হইল এখানকার নিরস্ত্র মানুষ তাঁহার দোষ প্রেসিডেন্টের লক্ষ্যগোচরই হইল না। ইহা কি একদেশদর্শিতার পরিচায়ক নয়? সে যাহাই হউক, সঙ্কট এড়াইতে হইলে অবিলম্বে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা একান্ত জরুরী। এয়ার মার্শাল নূর খান তো স্পষ্টতই বলিয়াছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসন করার আইনগত অধিকার রহিয়াছে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের সব রকম প্রতিবন্ধকতা অবিলম্বে দূর করা উচিত। এয়ার মার্শাল আসগর খানও শেখ মুজিবুর রহমানের শর্তাবলীকে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে করেন। বস্তুত ইহাই শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দেশ রক্ষা করার একমাত্র পথ।’

আজ সেই ৯ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মিছিলে মিছিলে উত্তাল ছিল সারা দেশ। ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই মূলত তাঁর নির্দেশ অনুযায়ীই চলছিল দেশ। চরমে পৌঁছেছিল দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন। উত্তাল এই দিনে ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসভায় বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে ভাষণ দিয়েছিলেন ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে পরিচিত মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। চিরাচরিত দরাজ কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, ‘হে বাঙালিরা, আপনারা মুজিবের উপর বিশ্বাস রাখেন, তাকে খামোকা কেউ অবিশ্বাস করবেন না, কারণ মুজিবকে আমি ভালোভাবে চিনি।’ ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অনেক হয়েছে আর নয়, তিক্ততা বাড়িয়ে লাভ নেই। লা-কুম দ্বিনিকুম অলইয়া দ্বিন’-এর মতো তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার; পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করে নাও।’

এদিকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে ছাত্র-তরুণরা। বিভিন্ন স্থানে চলে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি। অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সেনা সদস্যরা গোপনে নানা স্থানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর দামাল ছেলেদের। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ অসহযোগ আন্দোলনসম্পর্কিত সংশোধিত নির্দেশ জারি করেন।

একাত্তরের এই দিনে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘‘শেখ মুজিবের শর্ত মানিয়া ‘ভয়াবহ বিপর্যয়’ রোধে যত্নবান হউন : প্রেসিডেন্টের প্রতি পূর্বাঞ্চলীয় নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক সংস্থার আহ্বান”। প্রথম পাতায় ডানদিকে তিন কলামজুড়ে আরেকটি শিরোনাম ছিল ‘বাঙ্গালীতে বাঙ্গালীতে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির অপপ্রয়াস—তাজুদ্দীন’।

দৈনিক পূর্বদেশ শিরোনাম করেছিল ‘কালো পতাকার শহর’, ‘শিল্পীদের কর্মসূচী ঘোষণা’ ইত্যাদি।

মন্তব্য