kalerkantho

তোয়াক্কা নেই আচরণবিধির

রফিকুল ইসলাম ও হাসান মেহেদী    

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তোয়াক্কা নেই আচরণবিধির

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি কার্যত কেউ মানছে না। একের পর এক আচরণবিধি ভাঙলেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। হাত গুটিয়ে বসে আছেন নির্বাচন পরিচালনায় গঠিত রিটার্নিং অফিসাররাও। তাঁরা বলছেন, আচরণবিধি ভঙ্গের কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ প্রার্থীদের।

একদিন বাদে আগামী ১১ মার্চ সোমবার বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে তাদের।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে যুগোপযোগী আচরণবিধি প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জাতীয় নির্বাচনের মতো নির্বাচন কমিশন প্রণীত আচরণবিধির আলোকে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়। আচরণবিধি ভাঙলে আর্থিক দণ্ডের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য ধরে রাখা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্র জোট, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ও স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী আচরণবিধিকে পাত্তা দিচ্ছেন না।

ডাকসু নির্বাচনের আচরণবিধির ৫(ছ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে (যেমন-মসজিদ, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি) নির্বাচনী প্রচার চালানো যাবে না। কিন্তু গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর কেন্দ্রীয় মসজিদে ভোট চেয়ে প্রচার চালিয়েছেন ছাত্রলীগ মনোনীত সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ ঘোষিত প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী গোলাম রাব্বানী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, জুমার নামাজের পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মাইকে সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদের প্রার্থীদের জন্য ভোট ও দোয়া প্রার্থনা করেন। এই ভোট চাওয়ার একটি ভিডিও ক্যাম্পাসে সবার হাতে হাতে ঘুরছে। আচরণবিধি ভাঙলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছাত্রসংগঠন ও অন্য প্যানেলের প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগ প্যানেলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সঞ্জিত চন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মসজিদে ভোট চাওয়ার বিষয়টি আমি জানি না। তবে আমরা আচরণবিধি মেনেই নির্বাচন পরিচালনা করছি। বরং ছাত্রদল ও বাম জোটের প্রার্থীরাই নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করছে। এ বিষয়ে আমরা রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করব আর ব্যবস্থা নিতেও অনুরোধ জানাব।’

বাম জোট সমর্থিত প্যানেলের সহসভাপতি প্রার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ আচরণবিধি ভাঙলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চুপ। এমনকি কোনো বিষয়ে জানাতে গেলেও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে নির্বাচন কেমন হবে।’

আচরণবিধির ৪(গ) ধারায় বলা হয়েছে, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটার অথবা প্রার্থী ব্যতীত অন্য কেউ কোনোভাবেই কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচার চালাতে পারবে না। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও বাম জোটের প্রার্থীদের সঙ্গে বহিরাগতরাও নির্বাচনে প্রচার চালাচ্ছে। ছাত্রলীগের পক্ষে ক্যাম্পাসের আশপাশের সংগঠনের কয়েকটি ইউনিটের নেতারাও প্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত সাবেক শিক্ষার্থীও ছাত্রলীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা গেছে।

গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে দুই শতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে মিছিল করেছে ছাত্রদল। যদিও মিছিল করার আগে রিটার্নিং অফিসারের অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো অনুমতি না নিয়ে মিছিল করেছে সংগঠনটি। প্রগতিশীল ছাত্রজোটের প্যানেলও গতকাল ক্যাম্পাসে মিছিল করেছে, যা আচরণবিধির লঙ্ঘন।

আচরণবিধির ৬(খ) ধারায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হল এলাকায় অবস্থিত কোনো প্রকার স্থাপনা, দেয়াল, যানবাহন, বেড়া, গাছপালা, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি বা অন্য কোনো দণ্ডায়মান বস্তুতে লিফলেট বা হ্যান্ডবিল লাগানো যাবে না। কিন্তু টিএসসি ও হলগুলোর সামনের দেয়ালে লিফলেট ও ব্যানার দেখা গেছে।

আচরণবিধির ৮(ঘ) ধারায় নির্বাচনী প্রচারের জন্য কোনো প্রার্থীর ছবি বা তাঁর পক্ষে প্রচারমূলক কোনো বক্তব্য বা অন্য কারো ছবি বা প্রতীকের চিহ্নসংবলিত শার্ট, টি-শার্ট, জ্যাকেট, ফতুয়া বা কোনো ধরনের পোশাক ব্যবহার করা যাবে না বলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও টি-শার্টে প্রার্থীর পক্ষে প্রচার দেখা গেছে।

ছাত্রদলের প্যানেলের সহসভাপতি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে মিছিল করেছি, এটা নির্বাচনী প্রচার নয়। এটাতে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়নি।’

আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে প্রধান রিটার্নিং অফিসার মাহফুজুর রহমান ও উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানকে ফোন করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য