kalerkantho

মাছ ধরতে বিল শুকিয়ে বিরান

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ ও হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল    

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মাছ ধরতে বিল শুকিয়ে বিরান

ধর্মপাশায় মাছ ধরার জন্য শ্যালো মেশিন দিয়ে শুকিয়ে ফেলা হচ্ছে জলমহাল। ছবিটি সম্প্রতি উপজেলার ছোট্টকানিয়া বিল থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুনামগঞ্জ জেলায় মৎস্য আহরণের এই মৌসুমে ২০ একরের নিচের জলমহালগুলোয় সেচযন্ত্রের মাধ্যমে পানি শুকিয়ে ফেলা হচ্ছে। বেশি মাছ ধরার লোভে ছোট জলমহালগুলো শুকিয়ে ফেলছেন সংশ্লিষ্ট ইজারাদাররা। এতে একদিকে ফাল্গুন মাসেই ফেটে চৌচির হচ্ছে হাওরের ফসলি জমি। অন্যদিকে প্রজনন ব্যাহত হওয়ায় বিলুপ্ত হচ্ছে অনেক সুস্বাদু প্রজাতির মাছ।

মৎস্য অফিস, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও জলমহাল শুকানোর বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশকর্মীরা বিল শুকিয়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানোর দাবি জানালেও রহস্যজনক কারণে তা করা হচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশ সংগঠন সোচ্চার হলেও প্রশাসনের যোগসাজশে ইজারাদাররা তাদের সাজানো মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। ফলে হাওরে পরিবেশ ও প্রকৃতিবিনাশী ওই কার্যক্রম চলছেই।

অভিযোগ আছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার সিঙ্গির দাইর, সদর উপজেলার নলদিঘা বান্দেরকোনা গ্রুপ জলমহাল, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে বাইঞ্চাখাউড়ি গজারিয়া জলমহাল এবং একই উপজেলার বগলার ডুবি জলমহালে শ্যালো মেশিন দিয়ে শুকিয়ে মাছ ধরেছেন ইজারাদাররা। এ নিয়ে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট ইউএনও কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিল। কিন্তু অভিযোগকারী পরিবেশকর্মী ও কৃষকদের নামে উল্টো হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছেন ইজারাদাররা।

জানা গেছে, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহায়তায় সম্প্রতি ইজারাদারের লোকজন অভিনব এক কৌশল বের করেছে। তারা কিছু লোক ভাড়া করে তাদের কৃষক সাজিয়ে জমিতে সেচ দেওয়ার নাটকের আয়োজন করে প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করছে। কয়েকটি ঘটনায় স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে একই স্থানে একাধিক শ্যালো মেশিন দিয়ে বিল শুকানোর প্রমাণ পেয়ে প্রতিবেদন দিলেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কৃষকরা বলছে, সুনামগঞ্জের হাওরে বোরো জমিতে আগে কখনো শ্যালো মেশিনে পানি সেচ দিতে হতো না।

সুনামগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সুনামগঞ্জে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কারণেই হাওরের জমিতে মেশিনে সেচ দিতে হয় না। কুন্দ বা হেমইত দিয়ে অল্প জমিতে সেচ দেয় কৃষক। এই মৌসুমে ছোট জলমহালগুলোতে প্রশাসনের চোখের সামনেই একাধিক শ্যালো মেশিন লাগিয়ে প্রকৃতি বিনাশ করে মাছ নির্বংশ করে মাছ ধরে ইজারাদার। কেউ বাধা দিলে প্রশাসনের সহায়তায় উল্টো মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করাটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এদের বিরুদ্ধে নাগরিক উদ্যোগ প্রয়োজন। নাহলে হাওর মৎস্যশূন্য হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, প্রশাসন বর্ষা মৌসুমে মৎস্য আহরণের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করে শুকনো মৌসুমে পরিচালনা করলে মৎস্যসম্পদ রক্ষা পাবে।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বাইঞ্চাখাউড়ি গজারিয়া জলমহাল নিয়ে মামলা থাকার পরও ইজারাদার একাধিক শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি শুকিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি নেওয়ায় স্থানীয় এক কৃষক ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস তদন্তে গিয়ে সত্যতা পেয়ে প্রতিবেদন দিলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নলদিঘা বান্দেরকোনা গ্রুপ জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার প্রমাণের প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা আক্কাস আলী। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর মৌজার বগলার ডুবি জলমহালের পানি শুকিয়ে মৎস্য আহরণে বাধা দেওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের নামে হয়রানিমূলক মামলা করেছে ইজারাদেরর লোকজন। পাইকাপন মৎস্যজীবী সমিতির নামে ইজারা নেওয়া গ্রুপ জলমহালটি সাবলিজ দিয়ে শুকিয়ে মাছ ধরার প্রতিবাদ করছিল স্থানীয় কৃষকরা। গত জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে জলমহাল শুকাতে বাধাও দিয়েছিল আশপাশের জমির কৃষকরা। পরে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছেন ইজারাদার। এতে কাউয়াজুরী গ্রামের ১৪ কৃষক এখন আতঙ্কে আছে।

মৎস্য গবেষক প্রফেসর ড. মোস্তফা আলী রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বিচারে জলমহাল শুকিয়ে মৎস্য আহরণ করায় মাছের সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ মাখনা ও সিংরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কই, সিং মাছের উৎপাদন আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। মৎস্য আহরণের সময় বিলে সর্বনিম্ন এক সেন্টিমিটার পানি থাকার কথা থাকলেও ইজারাদার তা মানছেন না, যার ফলে মিঠাপানির মাছ এখন হুমকির সম্মুখীন।

ইজারার নীতিমালায় জলমহালের পানি শুকিয়ে মাছ ধরার নিয়ম তো নেই-ই; বরং জলমহাল খনন এবং পারে বৃক্ষ রোপণ করার শর্ত আছে। কিন্তু ওই সব শর্ত কেউ মানে না।

ধর্মপাশায় জলমহাল শুকানো চলছে এক মাস ধরে, কোথাও নামমাত্র জরিমানা

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় এক মাস ধরে শ্যালো মেশিন দিয়ে বিভিন্ন জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরা চলছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরই এই সময়ে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলমহালগুলোর পানি কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইজারাদাররা প্রতিটি জলমহালে পাঁচ-ছয়টি শ্যালো মেশিন বসিয়ে তা শুকিয়ে মাছ ধরা শুরু করে। এ বছরও মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরা চলছে। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তা চলবে বলে জানা গেছে। ইজারার নীতিমালা উপক্ষো করে জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরায় হাওর এলাকার জলমহাল থেকে মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি ওই সব জলমহালের চারপাশে থাকা বোরো জমিতে সেচ দেওয়া নিয়েও চরম বেকায়দায় পড়েছে এলাকার কৃষকরা।

সরেজমিনে ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার জালধরা, চট্টনিয়া বিল, শিমুলতলার খাল, গলাভাঙ্গা-গুল বিল, শ্বাসকার বিল, চাপলার বিল, কেউডির বিল, ইঙ্গার বিল, মুক্তির বিল, ছোট কানিয়া, শৈলচাপড়ার বিল, বন্নির বিল, জয়াধনা, বুয়ালা, নাননা দশপাশার বিল, মেধা-১, মেধা-২, লম্বার দাইড়, মুক্তির দাইড়, কালা গাঙ, কাইলানী, কৈজুড়া বিল, সাপ মাড়ির দাইড়, বাছা পানি বিল, শাপলানীর বিল, বুড়ার বিল, হুচ্ছুর বিল, কাইঞ্জার বিল, আড়িবন বিল, উড়ার বিল ও ফাঁসুয়ার জিনাইরিয়া বিলসহ উপজেলার বেশির ভাগ জলমহালই শ্যালো মেশিন দিয়ে শুকিয়ে মাছ ধরে নিয়ে গেছে ইজারাদারের লোকজন।

সম্প্রতি জালধরা হাওরে গেলে এলাকার কৃষক ইকবাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থ্যাইক্যাই আমরা এই জালধরা বিলের পানি দিয়া বোরো জমি আবাদ কইরা আইতাছি। এহন কয়েক বছর ধইরা এলাকার প্রভাবশালী লোকেরা এই বিল ইজারায় আইন্যা মেশিন দিয়া শুকাইয়্যা মাছ ধরায় আমাদেরকে অহন বোরো জমিতে ডিপ মেশিন বসাইয়্যা পানি দিতে হয়।’ নূরুল ইসলামসহ স্থানীয় আরো কয়েকজন কৃষক একই রকম অভিযোগ করেন।

উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনেকেই আমার কাছে এ ধরনের অভিযোগ করলেও লোকবলের অভাবে আমরা অনেক সময় ঘটনাস্থলে যেতে পারিনি। তবে শীঘ্রই আমরা সরেজমিনে ওই সব জলমহাল এলাকা পরিদর্শন করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ তিনি জানান, এ উপজেলায় ২০ একর আয়তনের ঊর্ধ্বে ৬৮টি এবং ২০ একরের নিচে ৪৫টি জলমহাল আছে।

উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্যালো মেশিন দিয়ে জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। জলমহাল শুকিয়ে যারা মাছ ধরছে তাদেরকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’

জালধরা জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার অভিযোগে এরই মধ্যে তিন ইজারাদারের কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা আদায়সহ দুটি শ্যালো মেশিন জব্দ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবু তালেব।

২০ একরের নিচের জলমহালগুলো ইজারা দিয়ে থাকে উপজেলা প্রশাসন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় ওই রকম ছোট জলমহাল আছে ৬২৫টি। এগুলো বেশির ভাগই তিন বছর মেয়াদে ইজারা দেওয়া হয়ে থাকে।

মন্তব্য