kalerkantho

খালে বিলে পানি নেই কিশোরগঞ্জে

একদিকে সেচ সংকট, অন্যদিকে ইঁদুরে কাটছে উঠতি ধান

নাসরুল আনোয়ার হাওরাঞ্চল   

৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খালে বিলে পানি নেই কিশোরগঞ্জে

চৈত্র মাসে আগাম পাহাড়ি ঢলে হাওরে বছরের একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সব সময় কৃষকদের তাড়া করলেও এই ফাল্গুনেই পানিশূন্য কিশোরগঞ্জের খাল-বিল। এতে সেচ সংকটে হিমশিম খাচ্ছে কৃষক। পাশাপাশি ইঁদুর কেটে সাবাড় করছে উঠতি ধানের গোছা।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার চমকপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘জীবনেও আমরা এমন ইন্দুর (ইঁদুর) দেখছি না। এইবার কানির কানি হেত (ক্ষেত) ইন্দুরে কাইট্যা শেষ কইরালতাছে। আর গাঙের বালু আইয়া আওরের (হাওরের) শতাশতি (শত শত) কানি জমি ডাইক্যালাইছে। আওর অহন যেমুন মরুবুমি।’

আব্দুল কুদ্দুস জানান, ঘাগড়া ও কেওয়ারজোড় ইউনিয়নে কয়েক হাজার একর বোরো জমি এবার পতিত রয়েছে। তাঁর মতে, বর্ষায় উজানের ঢলের সঙ্গে পলি এসে এসব জমি ভরাট করে ফেলছে। তাই জমির আল একাকার হয়ে মরুভূমির চেহারা ধারণ করছে। তিনি আরো জানান, ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচতে কৃষক জমিতে সব সময় পানি দিয়ে রাখছে। জমি না শুকাতে পারায় ধানের গোছাও পুষ্ট হচ্ছে না। এ কারণে এবার ফলন ভালো হবে না।

অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের কৃষক মো. ইউনুছ আলী জানান, কুশিয়ারার চরে এবার চার একর জমিতে ধান রোপণ করেন তিনি। ধান গাছে থোড় আসতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই ইঁদুরে কেটে সাবাড় করে ফেলছে। তিনি জানান, ঋণ করে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। চার একরে অন্তত ১৭৫ মণ ধান হওয়ার কথা। কিন্তু এবার একমুঠো ধানও পাবেন না।

দক্ষিণপাড়ার ইউসুফ আলী জানান, গ্রামের দক্ষিণের হাওরে এবার সাড়ে তিন লাখ টাকা সুদে এনে খরচ করে প্রায় ১৫ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। সব জমিতেই ইঁদুর আক্রমণ করেছে। বাজার থেকে বিষ এনে জমিতে দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। হতাশ হয়ে কয়েক দিন ধরে তিনি আর জমিতে যান না। বাড়ির পাশের কিছু জমির ধানগাছ কেটে এনে রোদে শুকাচ্ছেন। এখন ঋণ শোধ করতে জমি বিক্রি করতে হবে। জমিও তো কেউ নেবে না। তিনি জানান, স্বাভাবিক উপায়ে ফসল হলে হাজার মণের বেশি ধান পেতেন। ইঁদুর সব শেষ করে দিচ্ছে। ইঁদুর নিধনে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার বিষ কিনে জমিতে প্রয়োগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগাম বাইষ্যার পানি, হিলাবিষ্টি আর গাদলায় (টানা বৃষ্টিপাত) ফসল মাইর খাইতে খাইতে আমরা অহন অক্করে ফঙ্গু।’

খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুল হামিদ বলেন, তাঁর বোরো জমিতে থোড় আসতে শুরু করেছে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইঁদুর শেষ করে দিচ্ছে সব। মনের কষ্টে তিনি আর জমি দেখতেও যান না।

অষ্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাওরের একাংশ বিরানভূমির মতো। কৃষকরা জানায়, এসব জমিতে ধান চাষ করা হয়নি। আর চাষ করা অংশের রং গাঢ় সবুজ থাকার কথা থাকলেও বহু জায়গায় ধানক্ষেতে ছোপ ছোপ হলদে রং। ওই সব জমির ফাঁকে ফাঁকে ইঁদুর কেটে ধানের চারা জমিতে মিশিয়ে দিয়েছে বলে জানান উত্তরপাড়ার কৃষক হবিজ মিয়া। তিনি গোছা গোছা ইঁদুরে কাটা ধানগাছ হাতে নিয়ে দেখান। দেখা যায়, প্রতিটি জমিতেই অসংখ্য ইঁদুরের গর্ত।

দক্ষিণ আব্দুল্লাহপুরের কৃষক এক্তার মিয়া জানান, তিনি ধানের পাশাপাশি জমিতে বাঙ্গি, মিষ্টি কুমড়া প্রভৃতি চাষ করেছিলেন। ইঁদুর এসে কেটে দিয়েছে সবই।

সেচের অভাবে পতিত বহু জমি : আব্দুল্লাহপুর দক্ষিণ-পূর্বহাটির হাজি দৌলত মিয়া জানান, এক নম্বর চরে তাঁর ৫০ একরের মতো জমি আছে। দুই একরের মতো জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছিলেন। ইঁদুর সব কেটে দিয়েছে। বাকি জমি পতিত রয়ে গেছে। জমি আবাদ না করার কারণ সম্পর্কে তিনি জানান, কচুরিপানা আর পাহুরা নামে এক ধরনের পাহাড়ি ঘাস এসে জমি ভরাট হয়ে যায়। সাফ করতে গেলেও একরে পাঁচ-দশ হাজার টাকা খরচ পড়ে। আর সেচের সংকট, অকাল বন্যা, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি তো আছেই। কয়েক বছর ধরে নতুন উপদ্রব পোকা ও বাবুই পাখি। তাঁর মতে, ফসল পাকার পর ঝাঁকে ঝাঁকে বাবুই পাখি এসে ধানের জমিতে হামলে পড়ে সাবাড় করছে ধান।

ধলেশ্বরী নদী থেকে অষ্টগ্রামের অন্তত তিন হাজার একর জমিতে প্রায় ২৫টি সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হতো। কিন্তু ধলেশ্বরী এখন মৃতপ্রায়। ফলে এসব জমি এখনই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মো. কাসেদ মিয়া জানান, মেঘনা নদীর ইকুরদিয়া অংশে খননের মাটি গিয়ে ধলেশ্বরীর মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরো জানান, নদী খননের ফলে বড় হাওরের ইসলামপুরের কাছে বিলমাকসা নদীর মুখও ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বড় হাওরের অন্তত ৩০টি সেচ প্রকল্প পানি পাচ্ছে না। সেচের অভাবে ওই হাওরে রোপণ করা আরো কমপক্ষে পাঁচ হাজার একর বোরো জমি ‘শুকনায়’ পড়েছে। তিনি জানান, এক নম্বর চরের চার হাজার একর জমিই এবার পতিত পড়ে আছে।

হাওরের কৃষক-শ্রমিকের দুর্দশা এবং প্রকৃতি-পরিবেশ সম্পর্কে ‘হাওরের পাশে বাংলাদেশ’-এর সদস্যসচিব হাসনাত কাইয়ূম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনাকারীরা উপকার করতে গিয়ে দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে তোলেন। তাঁরা হাওরে যোগাযোগের উন্নয়ন করতে গিয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেন। ধান রক্ষা করতে নেমে মৎস্যসম্পদ শেষ করে ফেলেন। হাওর যে কারণে হাওর এবং যেভাবে পরিকল্পনা করলে হাওর, হাওরবাসী ও হাওরের প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা পায় সেভাবে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় না বা সেসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নও হয় না। তাঁদের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের উন্নয়নের নামে নিজেদের উন্নয়ন।’

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ জেলার উপপরিচালক শফিকুল ইসলাম হাওরের বোরো জমিতে ইঁদুরের আক্রমণ ও সেচের অভাবে জমি পতিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বিভিন্ন জায়গা থেকে ইঁদুরের আক্রমণের খবর আসছে। এ খবর পেয়ে তিনি নিজে হাওর পরিদর্শন করেছেন। তবে ইঁদুরের আক্রমণ এখনো মহামারি পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ইঁদুর দমনে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, সব মিলিয়ে হাজার দশেক একর বোরো জমি এবার পতিত রয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি পলি পড়ে প্রতিবছর খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচ সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মালিকরা জমি পত্তন দিতে পারছে না। খরচ দিয়ে পোষানো যায় না। ফলে বোরো চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন। তা ছাড়া কৃষি বিভাগ থেকেও বোরো চাষ নিরুৎসাহিত করে আউশ-আমন চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

 

মন্তব্য