kalerkantho

স্বাধীনতা ঘোষণার পথে

টিটু দত্ত গুপ্ত   

৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাধীনতা ঘোষণার পথে

পূর্ব বাংলা যে ক্রমেই স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সেটি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন পশ্চিমা সাংবাদিক ও কলামিস্টরা। একাত্তরের ৬ মার্চ লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য টাইমসে একটি নিবন্ধের শিরোনামই ছিল ‘East Pakistan Leader Could Declare UDI’। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের নেতা একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন। করাচি থেকে নিবন্ধটি লিখেছিলেন সাংবাদিক পিটার হেজেলহাস্ট।

নিবন্ধে ওই সাংবাদিক লিখেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে দুটি বিকল্প আছে—তিনি একতরফাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেন; অথবা নিজেই কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি ডেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের তাতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা ভুট্টো তাতে যোগ দিতে নিশ্চিতভাবেই অস্বীকৃতি জানাবেন। যদিও ওই অংশের অনেক নেতা শেখ মুজিবের সঙ্গে হাত মেলাতে প্রস্তুতি নেবেন।

নিবন্ধে আরো ছিল, এক দশকের সেনা শাসনে নিষ্পেষিত শেখ মুজিব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ক্ষমতায় গেলে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা কমানো হবে। ফলে পাঞ্জাব অধ্যুষিত সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্টের ওপর অ্যাসেম্বলির অধিবেশন প্রস্তুতি থামানোর জন্য চাপ দেবে এটা পরিষ্কার। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসান পদত্যাগ করার আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে পরামর্শ দিয়েছিলেন অধিবেশন স্থগিত না করতে। কিন্তু ইয়াহিয়া শুনেছেন তাঁর কেবিনেট সদস্যদের কথা। বাংলার উত্তাল গণজোয়ারের মুখে তাঁকে এখন অধিবেশনের নতুন তারিখ দিতে হচ্ছে। ইয়াহিয়ার প্রশাসনেরই অনেক পর্যবেক্ষক স্বীকার করেন, বল প্রয়োগ করে বাঙালি জাতির এ প্রবল জোয়ার ঠেকানো যাবে না। তবে ভুট্টোর কর্মকাণ্ডের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। অধিবেশনে যোগ দিতে প্রেসিডেন্টের আহ্বান ভুট্টো যদি অগ্রাহ্য করেন, তাহলে ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাত অনিবার্য। শেষ পর্যন্ত অ্যাসেম্বলি নিয়ে মতবিরোধ শেখ মুজিব ও ভুট্টো কিভাবে দূর করবেন তা বলা কঠিন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির সংবিধান অনুমোদন না দিলে ইয়াহিয়া পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবেন যেখান থেকে কেউ ফিরে অসতে পারবেন না। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করা ছাড়া শেখ মুজিবের হাতেও আর কোনো বিকল্প থাকবে না।

আজ সেই ৬ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে উত্তাল বাংলার প্রাণকেন্দ্র ঢাকায় ষষ্ঠ দিনের মতো হরতাল পালনকালে সর্বস্তরের মানুষ নেমে এসেছিল রাস্তায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শেষে তাঁরই নির্দেশে দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক এবং যেসব বেসরকারি অফিসে আগে বেতন দেওয়া হয়নি সেসব অফিস বেতন দেওয়ার জন্য খোলা রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে কী ভাষণ দেবেন তার জন্য চলছিল অধির প্রতীক্ষা।

একাত্তরের ৬ মার্চ সকাল ১১টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গেট ভেঙে পালিয়ে যায় ৩৪১ জন বন্দি। পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে সাতজন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়। সংবাদটি পরদিন প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে দৈনিক ইত্তেফাক। অন্যদিকে ৬ মার্চ লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে অপসারণ করে লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার খবরটিও পরদিন প্রথম পাতায় ছিল ইত্তেফাকের। তবে ওই উত্তপ্ত সময়ে ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে কুখ্যাত টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানোর উদ্দেশ্য যে মিলিটারির বুটের নিচে বাঙালির গণ-আন্দোলনকে পিষে ফেলা সেটা উপলব্ধি করতে পেরে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী টিক্কা খানকে শপথ পড়াতে অস্বীকৃতি জানান।

একাত্তরের ৬ মার্চ দুপুরে এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। তাঁর ওই ভাষণের পরপরই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি যৌথ বৈঠক হয়। প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের আলোকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে। ওই দুটি বিষয় নিয়েই পরদিন ইত্তেফাক ব্যানার হেডলাইন করেছিল।

ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের পরপরই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ মিছিল বেরিয়েছিল। এসব নিয়ে ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল ‘ঢাকার রাজপথে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা, কণ্ঠে কণ্ঠে ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ’। ছিল ঢাকায় আগের দিন অনুষ্ঠিত বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের সমাবেশের ছবিও।

একাত্তরের এই দিনে লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) নূর খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে। প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণে পরিস্থিতি অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর দোষারোপ করায় নূর খান দুঃখ প্রকাশও করেন। এ নিয়ে ইত্তেফাকের প্রথম পতায় পরদিন শিরোনাম করা হয় “‘নুর খান বলেন ঃ আইনতঃ শেখ মুজিবই দেশের শাসন পরিচালনার অধিকারী’ ঃ প্রেসিডেন্টের মন্তব্যে দুঃখ প্রকাশ ঃ অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান”।

ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতারা ৬ মার্চ এক বিবৃতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাংলাদেশের সব বেতারকেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করার দাবি জানান। এ ছাড়া খুলনায় ওই দিন সেনাবাহিনীর গুলিতে ১৮ জন শহীদ হন। ওই সব খবরও ছিল পরদিনের পত্রপত্রিকায়। ‘সংবাদ’ ৭ মার্চ যেসব শিরোনাম করেছিল সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ন্যাপের জনসভায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ঃ মুক্তির জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত’, ‘কৃষক সমিতির প্রতি ১৮ জন কৃষক নেতা ঃ গ্রামে গ্রামে গণসংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ’, ‘উদীচীর গণসমাবেশ’। পত্রিকাটির সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘বীর জনগণের প্রতি অভিনন্দন’।

মন্তব্য