kalerkantho

জামায়াত ছাড়তে তবু দ্বিধায় বিএনপি

এনাম আবেদীন   

৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জামায়াত ছাড়তে তবু দ্বিধায় বিএনপি

শরিক দল জামায়াতকে নিয়ে একের পর এক চাপের মুখে পড়লেও নিশ্চুপ রয়েছে বিএনপি। কারণ জোট থেকে জামায়াতকে বিদায় করার প্রশ্নে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যে কারণে বিএনপির তৃণমূল থেকে মধ্যম পর্যায়, এমনকি স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ নেতার মনোভাব জামায়াতের বিপক্ষে থাকলেও তা কাজে আসছে না। উপরন্তু শীর্ষ নেতৃত্বের মনোভাব স্পষ্ট না হওয়ায় বিএনপি নেতারা এ প্রশ্নে মুখ খুলতেও রাজি হচ্ছেন না।

যদিও বিএনপির সর্বস্তরের আলোচনায় জামায়াতকে এখন আর ‘প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক মিত্র’ বলে মনে করা হচ্ছে না। বরং দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে এ দলটিকে এখন ‘বোঝা’ বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এসব জেনেও কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় বিএনপির মধ্যেই অস্বস্তি ঘনীভূত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বিএনপির চালকের আসনের শীর্ষ নেতাদের সহযোগীরাই জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়টি ঠেকিয়ে রেখেছেন। ওই সহযোগীদের কেউ কেউ ভারতবিরোধী শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছেন বলে বিএনপিতে আলোচনা আছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের এক প্রস্তাবে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে জামায়াত নির্মূলেরও তাগিদ দেওয়া হয় উত্থাপিত ওই প্রস্তাবে। এর আগে ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক প্রস্তাবে বিএনপিকে জামায়াত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর এই অবস্থানের বাইরে জামায়াতের কারণেই প্রধান প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন আদায়ে বিএনপি বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বলে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা আছে। অনেকের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকায় সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন প্রকাশ্যেই বলেছেন, জামায়াতকে ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচন করতে দেওয়া হবে এটি জানলে তিনি ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে যেতেন না। 

জামায়াতে ইসলামীর ভেতরেই সংস্কারের দাবি তুলে ব্যর্থ হয়ে গত মাসে পদত্যাগ করেন দলটির অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে ও অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে দলটি নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।

এ রকম একটি দলকে নিয়ে ঘরে-বাইরে এমন চাপের মধ্যেও বিএনপির নিশ্চুপ থাকার কারণ জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেছেন ‘এটি বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল।’ অবশ্য তাঁর মতে, ‘এমন নীরবতা রহস্যময় ব্যাপার এবং এতে বিএনপির ক্ষতি হচ্ছে।’ গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘রাজনীতির ঊর্ধ্বে হলো নীতি। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর আদর্শ ও দেশপ্রেমই আমাদের অনুসরণ করা উচিত। কিন্তু আমরা তা করছি না।’ 

২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াত প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পক্ষে কিছু বলা মুশকিল।’ গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘দেখা যাক, এ প্রশ্নে আলোচনা হয়তো হবে। কিন্তু না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।’

২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক এলডিপির চেয়ারম্যান ড. অলি আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জামায়াত নেতাদের শাস্তি হয়েছে। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবিদার সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রয়েছে। সুতরাং জামায়াত প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়-দায়িত্ব সরকারের, বিএনপির নয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি কী সিদ্ধান্ত নেবে না নেবে সে পরামর্শ দেওয়ার অধিকার আমার নেই। কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের আদর্শে চলে।’

‘তা ছাড়া শরিক দল হিসেবে আমি ক্ষতিগ্রস্ত নই। কারণ এলডিপি অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ অনুসরণ করে না’ যোগ করেন বিশিষ্ট এই মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঘৃণ্য ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং দল বিলুপ্ত করার পরামর্শ দিয়ে সম্প্রতি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। তবে বিএনপি জামায়াত প্রশ্নে এখনো পর্যন্ত নির্বিকার এবং এ নিয়ে দলেও সমালোচনা হচ্ছে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার জন্য বিএনপির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কিন্তু দলের নেতারা সম্ভবত তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে।’

 

মন্তব্য