kalerkantho

ছাত্রলীগের আধিপত্যে কোণঠাসা অন্যরা

রফিকুল ইসলাম   

৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ছাত্রলীগের আধিপত্যে কোণঠাসা অন্যরা

১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য চলায় কোণঠাসা হয়ে আছে অন্যান্য ছাত্রসংগঠন। সিট বণ্টন ও অন্য যেকোনো কার্যক্রমে ছাত্রলীগের আধিপত্যের কারণে অন্য সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের দলে ভেড়াতে পারেনি। বরং হলে ঠাঁই পেতে ছাত্রদের বড় অংশই যুক্ত হয়েছে ছাত্রলীগে, মিটিং-মিছিলে সক্রিয় থাকায় পেয়েছে সিটও। এর বাইরে কেউ কেউ অন্য সংগঠনেও যুক্ত হয়েছে। তবে সে সংখ্যা খুব কম বলে জানায় সংগঠনগুলো।

ক্যাম্পাসে এ অবস্থার প্রভাব দেখা যাচ্ছে প্রায় তিন দশক পর হতে চলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে। ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে রাখা ছাত্রলীগ হলে হলে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারলেও অন্যরা এককভাবে তো দূরের কথা জোটবদ্ধ হয়েও পুরো প্যানেল দিতে পারেনি! এ কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হচ্ছেন অর্ধশতাধিক প্রার্থী।

সংগঠনগুলো বলছে, ভর্তির পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে থাকতে সংশ্লিষ্ট হলে সিটের নিশ্চয়তা চায়। ছাত্রলীগের একক আধিপত্য থাকায় তারা ছাড়া অন্য সংগঠন সিটের ব্যবস্থা করতে পারে না। এ কারণে অন্য সংগঠনগুলোতে কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে না। এতে ক্রমে দুর্বল হয়ে অনেক সংগঠন নামসর্বস্ব হয়েও পড়েছে।

সূত্র বলছে, প্রতিটি হলের সিট, খাবারের মান ও সহসাংস্কৃতিক কার্যক্রম দেখভালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি টিম রয়েছে। বেতনের বাইরে বাড়তি ফি ও আবাসন সুবিধা নিয়ে এই টিমে নেতৃত্ব দেন প্রাধ্যক্ষ, সঙ্গে কয়েকজন সহকারী শিক্ষকও যুক্ত থাকেন। কিন্তু এই হল প্রশাসনের কার্যক্রম কার্যত অচল। এক দশক ধরে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছে ছাত্রলীগ।

ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, এক ডজনের বেশি ছাত্রসংগঠন ক্রিয়াশীল বলা হলেও কার্যক্রম রয়েছে মাত্র কয়েকটি সংগঠনের। বর্তমানে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও বাম ঘরানার ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশন বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে ক্যাম্পাসে কর্মসূচি পালন করছে। কোনো কোনো সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আবার কারো কারো সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। নতুন কর্মী সংগ্রহেও ছোট সংগঠনগুলোর কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না।

ছাত্রলীগের (জাসদ-ইনু) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটির মাসুদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম বর্ষে যারা ভর্তি হয় তারা সিটের নিশ্চয়তা চায়; কিন্তু হলগুলোতে আমাদের কোনো কক্ষ বা সিট বরাদ্দ নেই। সিট দিতে পারি না বলে দলেও টানা যায় না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের একটি প্ল্যাটফর্ম, বাম ছাত্রসংগঠনের জোট এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে একটি স্বতন্ত্র প্যানেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এই প্যানেলের বাইরে স্বতন্ত্রভাবে ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে একাধিক শিক্ষার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

ছাত্রলীগ ডাকসুতে পুরো প্যানেলের পাশাপাশি হলগুলোতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত থাকা ছাত্রদল ডাকসুতে প্যানেল দিলেও হলে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারেনি, তবে দু-একটি পদে প্রার্থী দিয়েছে। বাম ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরাও হলে হলে আংশিক প্যানেল ঘোষণা করেছে।

ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক বাশার সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের চাপ, বয়স থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না দেওয়ায় অনেকে ভোটার হতে পারেনি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই প্রার্থী হতে চাইলেও ভয়ভীতি প্রদর্শন করায় তারা প্রার্থী হয়নি। প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণেও প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ডাকসুকে কেন্দ্র করে মধুর ক্যান্টিনে সহাবস্থান দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তা অকার্যকর। কার্যত ক্যাম্পাসে কোনো সহাবস্থান নেই।

কোটা আন্দোলনকারীদের প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নুরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা অনেকেই প্রার্থী হতে ইচ্ছুক ছিল; কিন্তু ক্ষমতাসীনদের চোখ রাঙানির কারণে আসতে পারেনি। হলগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য তাদেরই (ছাত্রলীগ)। সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য কোনো সিট বা কক্ষ বরাদ্দ না থাকায় আসতে চায়নি অনেকে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হলগুলোতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারিনি।’

ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও বাম জোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ও হলগুলো দখলদারি বজায় রেখেছে, যার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রার্থী হতে চাইলেও আসেনি। কারণ হলের সিটগুলো ছাত্রলীগের দখলে রয়েছে। আমরা যত দূর পেরেছি হলগুলোতে প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’

উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে পর আগামী ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল ঘোষণার পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এখন চলছে প্রচার-প্রচারণা। ডাকসুতে ২৫টি পদ ও হল সংসদে ১৩টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই হিসাবে ১৮টি আবাসিক হল ও ডাকসুতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে ২৫৯ জন প্রার্থী প্রয়োজন।

মন্তব্য