kalerkantho

‘এই উত্তাল জোয়ারে’

আজাদুর রহমান চন্দন   

৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘এই উত্তাল জোয়ারে’

“বঞ্চিত বাংলার নিপীড়িত ৭ কোটি মানুষের স্বাধিকার অর্জনের দাবীতে বাংলার নগর, শহর, বন্দর ও গ্রামের দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-জাগরণের যে অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি হইয়াছে, প্রত্যহই উহার সহিত সকল স্তরের মানুষের ‘স্রোত’ আসিয়া মিলিত হইয়া স্বাধিকার আন্দোলনের দৃপ্ত শপথে বলীয়ান মানুষের কণ্ঠের সহিত কণ্ঠ মিলাইয়া এই দাবীকে আরও বলিষ্ঠ করিয়া তুলিয়াছে।” ১৯৭১ সালের ৫ মার্চের চিত্র পরদিন এভাবেই ফুটিয়ে তুলেছিল দৈনিক ইত্তেফাক ‘এই উত্তাল গণজোয়ারে—’ শিরোনামে।

আজ সেই ৫ মার্চ। একাত্তরে অগ্নিঝরা মার্চে এই দিনে সারা বাংলায় অব্যাহত ছিল বাঙালির প্রবল প্রতিরোধ। দুপুরে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে থেকে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’—স্লোগান নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ বিশাল লাঠি মিছিল বের করেছিল। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙে ৩২৫ জন বন্দি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। কারাগারের ফটক ভাঙার সময় প্রহরীদের গুলিতে শহীদ হন সাতজন। গুলি চলে চট্টগ্রামেও। সেখানে বাঙালি-বিহারি সংঘর্ষ এবং সামরিক জান্তার গুলিতে শহীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ জনে। টঙ্গী শিল্প এলাকায় সেনাবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন কমপক্ষে চারজন। জনতা টঙ্গী ব্রিজের কাঠের অংশ উপড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেয় রাস্তা। রাজশাহী এবং যশোরেও মুক্তিকামী জনতার মিছিলে সেনাবাহিনীর গুলিতে হতাহত হয় অনেকে। তবে অত্যাচার-নিপীড়ন উপেক্ষা করে লালদীঘি ময়দানে আয়োজন করা হয়েছিল বিশাল সমাবেশের।

ঢাকায় সেদিন ছাত্রলীগের লাঠি মিছিলে অংশ নিয়েছিল স্বতঃস্ফূর্ত জনতা। ড. আহমদ শরীফের নেতৃত্বে ঢাকার লেখক-শিল্পীরা একাত্মতা ঘোষণা করে শহীদ মিনারে শপথ নেন। ওই সব ঘটনার সংবাদ আর প্রতিবাদ-বিবৃতিতেই ঠাসা ছিল পরদিনের সংবাদপত্রের পাতা। দৈনিক ইত্তেফাক সেদিন ব্যানার শিরোনাম করেছিল, ‘বাংলার বুকে এ গণহত্যা বন্ধ কর!’। প্রতিবেদনটি ছিল মূলত তখনকার পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের বিবৃতিনির্ভর। শিরোনামের নিচেই ছিল তিন কলামজুড়ে খাড়া আকৃতির ছবি, যার ক্যাপশন ছিল, ‘ঢাকার রাজপথে স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রামী সৈনিক-ছাত্রলীগ কর্মীদের লাঠি-শোভাযাত্রা’। প্রথম পাতায় অন্যান্য শিরোনামের মধ্যে ছিল, ‘প্রেসিডেন্ট কি ঢাকায়?’, ‘শেখ মুজিব সকাশে আসগর খান’, ‘টঙ্গীতে গুলীবর্ষণে ৪ জন নিহত, ২৫ জন আহত’।

সংবাদে শিরোনাম ছিল, ‘শহীদ মিনারে ছাত্র ইউনিয়নের জনসভা ঃ রক্তপাত ঘটাইয়া বাংলার মানুষের মুক্তি সংগ্রাম স্তব্ধ করা যাইবে না’, ‘মুক্তিসংগ্রামে যে কোন দলের সহিত শরীক হইতে প্রস্তুত ঃ ভাসানী’ ইত্যাদি। পূর্বদেশ পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিল, ‘স্বাধিকারের দাবীতে শিল্পী, সাংবাদিক ও মা-বোনেরা’।

করাচি থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকায় একটি শিরোনাম ছিল, ‘Army Withdrawn To Barracks@East Wing Protest Continues@Firing In Tongi, Rajshahi’। সামরিক কর্তৃপক্ষের একটি ঘোষণাসহ ঢাকার পরিস্থিতির বিবরণও ছিল প্রতিবেদনে।

 

মন্তব্য