kalerkantho

সিঙ্গাপুরে ওবায়দুল কাদের চিকিৎসা শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সিঙ্গাপুরে ওবায়দুল কাদের চিকিৎসা শুরু

সিঙ্গাপুরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় তাঁকে বহনকারী এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স সিঙ্গাপুর পৌঁছায় এবং ৮টা ৫০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরকে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর ব্যক্তিগত সচিব গৌতম চন্দ্র বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

এর আগে ঢাকার চিকিৎসকেরা জানান, পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত না হলেও আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তাঁর হৃদ্যন্ত্র কাজ করছে, রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের দরকার কমে গেছে, প্রস্রাব স্বাভাবিক হয়েছে, ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে রক্তে সংক্রমণ ও আগের দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার জটিলতা কাটছে না। এ পরিস্থিতিতে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকাল সোমবার বিকেলে তাঁকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেছেন, ভারতীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেবী শেঠি বাংলাদেশের চিকিৎসার প্রশংসা করলেও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর এ মত প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হলে তিনিও বাইরে পাঠানোর ব্যাপারে একমত হন।

রবিবার সন্ধ্যা থেকেই সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একটি এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। গতকাল এ অঞ্চলের খ্যাতিমান হৃদেরাগ বিশেষজ্ঞ ভারতের দেবী শেঠিও বিশেষ বিমানে করে উড়ে এসে ওবায়দুল কাদেরকে দেখতে হাসপাতালে যান এবং তাঁর মতামত জানান। পরিবারের সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শেষে বিকেল সোয়া ৩টায় ওবায়দুল কাদেরকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে অ্যাম্বুল্যান্সযোগে নেওয়া হয় বিমানবন্দরের উদ্দেশে।

এর আগে দুপুর আড়াইটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিল্টন হলে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদেরাগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আলী আহসান বলেন, ‘ওবায়দুল কাদেরের হৃদ্যন্ত্র ভালো কাজ করছে, রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, নড়াচড়া করছেন, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রয়োজন কমে গেছে, প্রস্রাব স্বাভাবিক হয়েছে। ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিডনি ভালো আছে। এসব দেখে বলা যায় তিনি ভালো আছেন, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল আছে এবং উন্নতির দিকে যাচ্ছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘এর পরও তাঁর কষ্ট আরো কমানোর জন্য তাঁকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখা হয়েছে। আর সিওপিডি থাকার কারণে তাঁর যন্ত্রগুলো খুলতে একটু সময় লাগবে।’

ওবায়দুল কাদেরকে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে প্রেস ব্রিফিংয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যালের ভিসি অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা আগেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। এরপর যেহেতু দেবী শেঠি আসছিলেন সে জন্য তাঁর মতামতের অপেক্ষায় ছিলাম। এ ছাড়া দর্শনার্থীদের ভিড়, অন্যদের ভিড়, চিকিৎসকদের ভিড়ও একটা সমস্যা তৈরি করে। তা ছাড়া উনার রক্তে কিছু ইনফেকশনের ব্যাপার আছে। আগের দিন যা ছিল ১৮ হাজার কাউন্টিং, তা এখন ২৬ হাজারে উঠেছে। সব মিলিয়ে দেবী শেঠির মতামত আমরা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি, তিনিও বাইরে পাঠানোর ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তাই পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

দেবী শেঠির উদৃ্লতি দিয়ে ডা. কনক কান্তি বলেন, “দেবী শেঠি আমাদের বলেছেন, ‘এখানে ঠিক চিকিৎসাই চলছে। ইউরোপ-আমেরিকায়ও একই চিকিৎসা। এর পরও আমাদের দেশ ভারতে রাজনীতিবিদদের বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটা চাপ থাকে, সে জন্য যা করে থাকি সেটা হচ্ছে অন্য কোথাও বেটার প্লেসে পাঠিয়ে দেওয়া। তো সেই দিক থেকে আপনারা চাইলে এখন কোথাও স্থানান্তর করতে পারেন। কারণ এখন তাঁর শারীরিক অবস্থা যা আছে, তা অনেকটাই নিরাপদ। এ অবস্থায় থাকার সময়ই তাঁকে স্থানান্তর করা ভালো হবে।’ সেদিক থেকে দেবী শেঠির পরামর্শও আমরা নিয়েছি। তিনি আমাদের কার্ডিওলজি টিমকে বারবার অভিনন্দন জানিয়ে গেছেন।”

আগের দিন বারবার ওবায়দুল কাদের শঙ্কামুক্ত নন বলে জানানোর বিষয়ে ভিসি বলেন, ‘গতকাল (রবিবার) সকালে উনার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। বিকেলেও যেমন ছিল, তার চেয়েও এখন অনেক ভালো আছে। স্থিতিশীল আছে। অনেক ওষুধ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পরও বলছি ঝুঁকিমুক্ত-শঙ্কামুক্ত বলা যায় না, ঝুঁকি আছেই।’ তিনি বলেন, ‘ওবায়দুল কাদেরের অনেক আগে থেকেই ফুসফুসে সমস্যা ছিল, হার্টে আগেও অ্যাটাক হয়েছিল, উনাকে ভর্তি হতে বলেছিলাম; কিন্তু উনি অনিয়মিত ছিলেন। বলতেন তিনি ভালোই আছেন।’

বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। এ সময় সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াও ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ইশরাতুন্নেসা কাদের ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদেরাগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবু নাসের রিজভী তাঁর সঙ্গে সিঙ্গাপুরে রওনা দিয়েছেন।

এদিকে গতকাল ওবায়দুল কাদেরকে দেখে এসে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের একজন খ্যাতিমান হৃদেরাগ বিশেষজ্ঞ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সবার উচিত এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মিডিয়াসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে এত বেশি বাহ্যিক আয়োজন দেখা গেছে, যা চিকিৎসকদের চাপ তৈরি করে। এতে অনেক সময় সুষ্ঠু চিকিৎসার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।’ তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা এখানেই ঠিকঠাক চলছিল; কিন্তু পারিপার্শ্বিক উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাইরে পাঠানো হলো। এটা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আমাদের সামনে এক রকম নজির তৈরি হয়ে থাকল।’

সারা দেশে দোয়া : ওবায়দুল কাদেরের সুস্থতা কামনা করে বিবৃতি দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল যৌথ বিবৃতিতে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করছি ওবায়দুল কাদের যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন।’ এ ছাড়া হবিগঞ্জ, নীলফামারী, ময়মনসিংহ ও ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগ এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এলাকায় দোয়া মাহফিল হয়েছে। ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর কবীর এবং জেলার স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট লাবলু মোল্লার উদ্যোগে পৃথক দোয়া মাহফিল হয়।

মন্তব্য