kalerkantho

‘অগ্নিগর্ভ দেশ পথে নেমেছে’

আজাদুর রহমান চন্দন   

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘অগ্নিগর্ভ দেশ পথে নেমেছে’

‘কলকারখানায় বাজছে না বাঁশী। মানুষ নেই অফিস আদালতে। অগ্নিগর্ভ দেশ আজ পথে নেমেছে। এক দুই করে কাল কেটে গেছে চারদিন। প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় দেশ অগ্নিগর্ভ। বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা যেন ভেঙ্গে পড়েছে। স্বাধিকার আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছে মানুষ রংপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকায়—বিক্ষুব্ধ এই বাংলাদেশে—।’ এই ছিল ১৯৭১ সালের ৪ মার্চে বাংলাদেশের চিত্র, যা প্রকাশ করেছিল পরদিন দৈনিক পাকিস্তান। পত্রিকাটির প্রধান প্রতিবেদনের ওই ইন্ট্রো বা সূচনার নিচেই পাশাপাশি আলাদা ছোট শিরোনাম ছিল ‘চট্টগ্রাম ঃ ১২০ জন নিহত’, ‘ঢাকা ঃ বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে’ এবং ‘খুলনা ঃ ৭ জন নিহত’। প্রধান শিরোনামের ডান দিকে দুই কলামজুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিবৃতি, যার শিরোনাম ছিল, ‘মুক্তি সংগ্রাম যে কোন মূল্যে চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে ঃ মুজিব’।

গণবিক্ষোভে উত্তাল ছিল ১৯৭১ সালের ৪ মার্চ। ওই দিন সামরিক জান্তার কারফিউ ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে এসেছিল লাখো মানুষ। হরতাল চলাকালে খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ছয়জন শহীদ হন। চট্টগ্রামে দুই দিনে প্রাণহানি ঘটে ১২১ জনের। ঢাকায় আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় হরতালে দমন-পীড়নের নিন্দা জানানো হয়। ওই দিন ছিল দেশব্যাপী লাগাতার হরতালের তৃতীয় দিন। লাগাতার হরতালে ঢাকাসহ সারা দেশ অচল হয়ে পড়ে।

অগ্নিঝরা মার্চের ৪ তারিখেই কার্যত কায়েম হয়ে গিয়েছিল দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন। পরদিন ঢাকার সংবাদপত্রগুলোতে ফুটে উঠেছিল স্পষ্টভাবে। দৈনিক ইত্তেফাক সেদিন আট কলামজুড়ে রিভার্সে শিরোনাম করেছিল, “জয় বাংলার’ জয়”। নিচে ছিল বঙ্গবন্ধুর ছবি। প্রধান প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, “ক্ষমতার দুর্গ’ নয়, জনগণই যে দেশের সত্যিকার শক্তির উৎস, বাংলাদেশের বিগত তিনদিনের ঘটনাবলী তাহাই নিঃসন্দেহভাবে সপ্রমাণিত করিয়াছে। ‘অস্ত্রের ভাষার’ মোকাবিলায় স্বাধিকারকামী নিরস্ত্রের সংগ্রাম প্রথম পর্বে জয়যুক্ত হইয়াছে।”

একাত্তরের ৪ মার্চ দেওয়া (পরদিন প্রকাশিত) বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ প্রধান ও জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, হরতালের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যেসব কর্মী বেতন পাননি তাঁদের সুবিধার্থে প্রতিদিন দুই ঘণ্টার জন্য ব্যাংক খোলা থাকবে। বাংলাদেশের জন্য অনধিক পনেরো শ টাকা পরিমাণ বেতনের চেকই কেবল ক্যাশ করা যাবে। স্টেট ব্যাংকের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে বাংলাদেশের বাইরে কোনো টাকা পাঠানো যাবে না।

আলাদা বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মওলানা ভাসানী বলেন, ওরা সাম্রাজ্যবাদের দালাল। ওদের শোষণ-নির্যাতনে ৮৫ ভাগ বাঙালি আজ প্রায় মৃত্যুর সম্মুখীন। ওই বিবৃতিটিও পরদিন গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে পত্রিকাগুলো।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) ওই দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যে জনসভা করেছিল তার খবরও ছাপা হয়েছির বিভিন্ন পত্রিকায়। ওই সভায় বাংলার স্বাধিকারের সংগ্রাম বানচাল করার অপচেষ্টা রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন সংগঠনের সভাপতি নুরুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সামরিক আইন প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন। দৈনিক ইত্তেফাক পরদিন খবরটি প্রচার করেছিল প্রথম পাতায়। পূর্বদেশ পত্রিকার শিরোনাম ছিল, ‘সাংবাদিক ইউনিয়নের দাবি ঃ অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করুন’।

একাত্তরের ৪ মার্চ করাচি প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি জানান। পরদিন করাচি থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকায়ও খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল। এর শিরোনাম ছিল, ‘Transfer Of Power To Awami League Now@Only Solution Of Crisis’|

পিডিপিপ্রধান নূরুল আমিন ওই দিন ঢাকায় এক বিবৃতিতে ১০ মার্চ ঢাকায় রাজনৈতিক নেতাদের সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে প্রেসিডেন্টের প্রতি অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঢাকায় আহ্বান করার দাবি জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে ইত্তেফাক পরদিন প্রথম পাতায় ওপরের দিকে (ডানে) শিরোনাম করেছিল, ‘গোল টেবিলে নয়,—জাতীয় পরিষদে’।

 

মন্তব্য