kalerkantho


মাতৃভাষা দিবসের সভায় প্রধানমন্ত্রী

ষড়যন্ত্র এখনো চলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ষড়যন্ত্র এখনো চলছে

বিএনপি জোটের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণে জনগণ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাঙালির ওপর পাকিস্তানিদের দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই সময়ের মতো এখনো ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনাসভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা, ১০ বছরে বিএনপি-জামায়াতের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা, আওয়ামী লীগ সরকারের নানা অর্জন ও আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ভালো থাকলে কিছু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। দেশে যদি কোনো মার্শাল ল জারি হয়, অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতা দখল করে, তখন তারা খুব শান্তিতে থাকে। কারণ তারা ক্ষমতার বাতাস পায়। সে আশায় তারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৮ সালে কিন্তু বিএনপি জোট মাত্র ২৮টা সিট পেয়েছিল। এটা মনে রাখা উচিত। আর সেই নির্বাচনে ৮৬ ভাগ ভোট পড়েছিল। ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকানোর নামে যে অগ্নিসন্ত্রাস মানুষ হত্যা বিএনপি করে গিয়েছিল, ২০১৫-এর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তাদের সেই তাণ্ডব, আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষগুলোকে তারা পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। সেগুলো মানুষের মনে আছে। তারা কী না পারে? তাদের মানুষ ভোট দেবে কেন? প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। ৫০০-এর মতো মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। তাদের প্রতি কারো সহানুভূতি দেখি না। যারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে, যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুড়িয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাস, রেল, ট্রাক কি না পুড়িয়েছে তারা! গাছ কেটে ফেলেছে, রাস্তা কেটে ফেলেছে, ধ্বংসাত্মক কাজ করেছে। জনগণ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় তাদের যে কর্মকাণ্ড; তারা নির্বাচন কিভাবে করেছে—একেকটা সিটে কয়েকজনকে মনোনয়ন দিয়েছে। প্রায় ৮০০-৯০০ জনকে মনোনয়ন দিয়েছে। একেকটা সিটে দুজন, তিনজন করে মনোনয়ন দিয়েছে। এসব সিট তো তারা অকশনে দিয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের মনোনয়ন অকশনে দেয়। যে টাকা দিতে পারছে তার মনোনয়ন হচ্ছে, যে পারছে না তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এমন অনেক সিট আছে, আমি জানি, যেখানে যাদের মনোনয়ন দিলে জিতে যেত তাদের মনোনয়ন দেয়নি।’

শেখ হাসিনা বিএনপির মনোনয়ন বাণিজ্যের প্রসঙ্গে বলেন, ‘আবার কাউকে মনোনয়ন দিয়েছে বিদেশে বসে। সে দেশে নাই বিদেশে বসে নমিনেশন পেয়ে অ্যাম্বাসিতে গেছে নমিনেশন পেপার সাবমিট করতে। সেখানে অ্যাম্বাসি যখন বলেছে, নমিনেশন পেপার গ্রহণ করবে কী করে! যখন অ্যাম্বাসি নেয় নাই তখন খুব রেগে গিয়ে বলেছে, লন্ডনে অমুককে এত টাকা দিলাম, তিনি বললেন অ্যাম্বাসিতে দিলেই হবে। এখন কেন হচ্ছে না?’

তিনি বলেন, ‘যারা মনোনয়ন নিয়ে বাণিজ্য করেছে তারা জিতবে কোথা থেকে আর কিভাবে? সবচেয়ে বড় কথা, যুদ্ধাপরাধী-জামায়াত যারা নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত না তাদের মনোনয়ন দেওয়াতে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের এ দেশের মানুষ ভোট দেবে না, দেয়নি।’

মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো জাতিকে যখন শোষণ করা হয়, নির্যাতন করা হয়, বঞ্চনার অভিশাপে যে জাতি অভিশপ্ত হয়, সে জাতির ভাগ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে তারা সব সময় আঘাত হানে সংস্কৃতির ওপর, ভাষার ওপর। আর আমাদের ওপর সেই আঘাত এসেছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তৈরি হওয়ার পরপরই। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে ওই পাকিস্তানিরা আর শোষণ, বঞ্চনার শিকার হয় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। প্রথম আঘাতটাই তারা দিল আমাদের ভাষার ওপর। বাংলা ভাষায় কথা বলা যাবে না, আমাদের হাসি কান্না, আমাদের অনুভূতি কোনো কিছুই প্রকাশ করা যাবে না আমাদের মাতৃভাষায়। এমন একটি ভাষাকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সৃষ্টি করা হলো যে ভাষাটি কিন্তু কারো মাতৃভাষা নয়। কিছু ভাষার সমন্বয়ে উর্দু ভাষার সৃষ্টি।’

২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার স্মৃতিচারণা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কানাডায় দুই প্রবাসী রফিক ও সালাম। আমি তাঁদের বলতাম আপনারা বোধ হয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রফিক ও সালামের আত্মা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। কয়েকটি দেশের কয়েকজন ক্ষুদ্র ভাষাভাষি মিলে কানাডায় একটি সংগঠন গড়ে তোলে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য। তাঁরা জাতিসংঘের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র প্রস্তাব না দিলে জাতিসংঘ সেটা গ্রহণ করে না। সালাম ও রফিক যখন আমাদের কাছে খবরটা দিল আমরা সঙ্গে সঙ্গে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রস্তাব তৈরি করে তা জাতিসংঘে পেশ করি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেসকোর যে বার্ষিক সম্মেলন সেখানে কিন্তু আমরা আমাদের এই দাবিটি বাস্তবায়ন করতে পারি। সেখান থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে। যারা রক্ত দিয়ে গেছে তাদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না, বৃথা যায়নি। এই রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার যেমন পেয়েছি তেমনি বিশ্বব্যাপী ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মর্যাদা পেয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ কিন্তু একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র। ইউরোপের দেশগুলো যেমন ভাষাভিত্তিক। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যারা ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য ১৯৭৫-এর পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা না বাংলা ভাষায় বিশ্বাস করত, না বাংলা সাহিত্যে বিশ্বাস করে, না বাংলা সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে। তারা আসলে আমাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। যে কারণে আমাদের দেশের অগ্রগতি বা উন্নতি হয়নি। অগ্রগতিটা তখনই হলো যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলার জনগণের প্রতি।’

শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যের শুরুতে ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং চকবাজারের সাম্প্রতিক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

আলোচনাসভায় বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ২১শে পদকপ্রাপ্ত লেখক ইমদাদুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নগুলোকে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন করে চলেছেন। তিনি তাঁর স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের আকাশের মতো। তিনি আকাশ থেকে দেখছেন তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন।’

আলোচনাসভায় বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান, কার্যনির্বাহী সদস্য আখতারুজ্জামান প্রমুখ। আলোচনাসভাটি সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ এবং উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

 



মন্তব্য