kalerkantho


ব্যবসায়ী চাপে নত ডিএসসিসি

কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ঠেলাঠেলিতেই ব্যর্থ মৃত্যুকূপ স্থানান্তর

শাখাওয়াত হোসাইন   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ব্যবসায়ী চাপে নত ডিএসসিসি

চকবাজারে আগুন লাগা সেই ওয়াহিদ ম্যানশনের বেইসমেন্টে এখনো রাসায়নিক দ্রব্য মজুদ রয়েছে। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট সব কটি সরকারি দপ্তর। নিজস্ব উদ্যোগে কোনো ধরনের অভিযান পরিচালনা করেনি বিস্ফোরক পরিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস। পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসার ছাড়পত্র বন্ধ রেখেই দায়িত্ব শেষ করেছে এই চার সরকারি দপ্তর। কিন্তু গুদামে মজুদ রাখা অতি দাহ্য রাসায়নিক সরানোর দিকে মনোযোগ দেয়নি কেউ। তারা দায় চাপাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওপর। আর রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের চাপে ধরাশায়ী সিটি করপোরেশন।

২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে ভয়াবহ আগুন মারা যায় ১২৪ জন। ওই ঘটনায় যতগুলো তদন্ত কমিটি হয়েছে তাদের সবার সুপারিশ ছিল ওই এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেওয়া। কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক পল্লী করার প্রকল্প করা হয়। কিন্তু গত প্রায় ৯ বছরে ওই এলাকা থেকে কিছু সরানো হয়নি। সরানো হয়নি রাসায়নিক পল্লীও। এ প্রেক্ষাপটেই গত বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় ভয়াবহ আগুনে নিভে গেছে ৬৭ প্রাণ। এ ঘটনার পর আবার রাসায়নিকের অবৈধ ব্যবসা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, পুরান ঢাকায় রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম গড়ে উঠেছে দীর্ঘ বছর আগে। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসায় যুক্ত থাকায় পুরান ঢাকা থেকে অন্য এলাকায় সরতে ইচ্ছুক নয় ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া ডিএসসিসির পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করলেও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বাধায় আটকে যায় কাজ। স্থানীয় কাউন্সিলর ও ব্যবসায়ী নেতারা রাসায়নিক গুদাম না সরাতে সিটি করপোরেশনের ওপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইমপোর্টার্স অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাজাকাত হারুন ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদের পক্ষ থেকেও চাপ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনও চাপ প্রয়োগ করে ডিএসসিসির ওপর। চাপের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন কয়েকজন কাউন্সিলর। তবে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তাঁরা। ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় বড় ধরনের অভিযান বাস্তবায়ন করতে চায় না সিটি করপোরেশনও।

রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক মতবিনিময়সভায় ব্যবসায়ী নেতারা ডিএসসিসি মেয়র এবং সংশ্লিষ্ট সব কটি বিভাগের প্রতিনিধিদের আহ্বান জানান। মতবিনিময়সভায় উপস্থিত হয়ে শর্ত সাপেক্ষে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ব্যাপারে জোরালো দাবি জানান দেশের বণিক সমিতিগুলোর ফেডারেশন-এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন।

সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দাবি জানিয়েছিলাম দাহ্য ২৯টি রাসায়নিক না রাখার শর্তে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে। কিন্তু এখন আর পুরান ঢাকায় ওই দাবি করা সমীচীন নয়। রাসায়নিক গুদামের কারণে এভাবে আর কোনো প্রাণ নষ্ট হোক আমরা চাই না।’

চাপ দেওয়ার অভিযোগ বিষয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা চাপ দেন, এটা যেমন সত্য; তাঁদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা হয়নি, এটাও সত্য। রাসায়নিক পল্লীর কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত।’

কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হাজি মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাসায়নিক গুদামের তথ্য গোপন করে সিটি করপোরেশেনের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন সংগঠনের সভাপতি আব্দুল জলিল এবং সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন মাসুদ। দাহ্য কেমিক্যাল না থাকার ঘোষণার পরও এত বড় অগ্নিকাণ্ড কিভাবে হলো? বৈধ ব্যবসায়ীয়রা এখন বিপদে। অন্যদের পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘সিটি করপোরেশন অভিযান চালালে রাজনৈতিকভাবে তাদের ম্যানেজ করা হয়। এই কাজে সহায়তা করেন এই ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাকর্মী ও কাউন্সিলররা।’

জানা গেছে, আব্দুল জলিল চাঁদপুরের কচুয়ায় এবং আরিফ হোসেন মাসুদ লালবাগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে দলে তাঁদের পদ-পদবি জানা যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইমপোর্টার্স অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাজাকাত হারুন ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

নিমতলীর ট্র্যাজেডির পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্স কারখানা আইন, পরিবেশ আইন, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেছিল। রাসায়নিক গুদাম পুরান ঢাকা থেকে সরানোর জন্য যা করণীয় সেটা বিস্ফোরক পরিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস করবে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপিয়েই মুক্তি পেতে চায় তারা।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের দাবি, নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক ব্যবসার জন্য পুরান ঢাকায় একটিও ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। ছাড়পত্র না দেওয়ায় দাহ্য রাসায়নিক রয়েছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এ দপ্তর বলছে, নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর দীর্ঘ ৯ বছরে ঢাকার বাইরে নিরাপদ স্থানে ২০০টির মতো রাসায়নিক গুদামের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিজেল ও পেট্রোলিয়াম ব্যবসার জন্য সারা দেশে সাত হাজার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। পুরান ঢাকায় ৪০টির মতো অভিযানে সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করা হয়েছে বলেও দাবি করে বিস্ফোরক পরিদপ্তর।

বিস্ফোরক পরিদপ্তর দাবি করেছে, নিজস্ব জনবল ও বিচারিক ক্ষমতা না থাকায় পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরানো সম্ভব হয় না।

প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো ছাড়পত্র পুরান ঢাকায় না দেওয়ায় পরিদর্শনের দায়িত্ব আমাদের ওপর না। তবে সিটি করপোরেশন কোনো সহায়তা চাইলে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়।’

নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কোনো রাসায়নিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ছাড়পত্র দেয়নি ফায়ার সার্ভিসও। সংস্থাটির দাবি, পুরান ঢাকায় কতগুলো রাসায়নিক কারখানা রয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই কারো কাছে। চকবাজার, বংশাল ও লালবাগ থানা এলাকার বেশির ভাগ বাড়িতে কোনো না কোনো রাসায়নিকের গুদাম বা কারখানা রয়েছে। অবৈধভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে ব্যবসা। ছাড়পত্র বন্ধ রাখার পরও অভিযান পরিচালনা করলে নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ভয়ে কোনো অভিযান বা পদক্ষেপ নেয়নি সংস্থাটি।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনুমতি না নিয়ে বিপজ্জক রাসায়নিক ব্যবসা যারা করে তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে। নৈতিকভাবে আমরা কোনো অভিযান চালাতে পারি না।’

একই ধরনের দাবি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দিন আহম্মেদ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের পরিচালক ড. মু. সোহরাব আলীর। সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপিয়েছেন তাঁরাও।

তবে সিটি করপোরেশনের দাবি, পুরান ঢাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা অন্য সব এলাকা থেকে ভিন্ন। ব্যবসায়ী সংগঠন অনেক সময় চাপ দেয়। এর পরও ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে গুদাম ও কারখানা সিলগালা করা হয়। কিন্তু জনবহুল ও ঘিঞ্জি হওয়ার কারণে প্রতিটি বাড়িতে নজরদারি সম্ভব হয় না। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর ডিএসসিসির পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু অভিযানে কারিগরি সহায়তার জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতা নিতে হয়। কারণ রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মতো জনবল এবং দক্ষতা কোনোটাই নেই সিটি করপোরেশনের। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের জড়িত করে তাদের মাধ্যমেই সরানো হবে সব রাসায়নিক গুদাম। সরতে না চাইলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীদের।

ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ১৯ তারিখও সংশ্লিষ্ট সব কটি সংস্থার সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি রাসায়নিক কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের চাপ থাকলেও থেমে থাকার সুযোগ নেই আমাদের। কেমিক্যাল কারখানা সরানোর দায়িত্ব সব সংস্থার। সরানোর কাজের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জড়িত করে সরানো হবে গুদাম ও কারখানা।’



মন্তব্য