kalerkantho


রাসায়নিক গুদামগুলো কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর

আমলাতন্ত্রে আটকে আছে প্রকল্প

আরিফুর রহমান   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আমলাতন্ত্রে আটকে আছে প্রকল্প

রাজধানীর নিমতলীতে ২০১০ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানির পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের সব গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নিতে আন্দোলন শুরু হয়। পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন মহলের আন্দোলনের মুখে পুরান ঢাকা থেকে ওই বছরই রাসায়নিক কারখানা কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু ওই পর্যন্তই। আট বছর পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। এখনো জমি অধিগ্রহণপ্রক্রিয়াই শেষ করতে পারেনি শিল্প মন্ত্রণালয়। অথচ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নিমতলীর মতো এবার চকবাজারে আগুনে এত মানুষকে প্রাণ হারাতে হতো না।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা সরিয়ে কোথায় নেওয়া হবে তা ঠিক করতেই বেশ কিছু সময় চলে যায়। অবশেষে সব পক্ষের সম্মতিতে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেখানে ৫০ একর জায়গা পেতেই সময় লেগে যায় চার বছর। পাশাপাশি প্রকল্প তৈরি থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত বাকি সময় চলে গেছে। মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই প্রকল্পটি শুরু করতে দেরি হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক কারখানা সরিয়ে নিতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০১০ সালেই। কিন্তু কমিটি গঠন করা হলেও সমন্বয়হীনতা আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। এর পরও মন্ত্রণালয় বলছে, ২০২১ সালের মধ্যে তারা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চায়।

সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক শিল্প পল্লী নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্পটি গত বছরের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমিতে ৯৩৬টি প্লট নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনো জমি অধিগ্রহণ নিয়ে চলছে জটিলতা। সবেমাত্র একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কবে নাগাদ এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে তা বলতে পারেননি পিডিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কেউ।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক সাইফুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমি পাওয়া বেশ মুশকিল। জমির দাগ-খতিয়ান ঠিক করতে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। প্রকল্পটি তৈরি করতেও সময় বেশি লেগেছে।

বুধবার রাতে চকবাজারে অগ্নি-দুর্ঘটনার পর আবারও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুটছে মন্ত্রী ও মেয়রের পক্ষ থেকে। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানির পরও এমনটা দেখা গেছে। অথচ ওই ঘটনার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও পুরান ঢাকায় বেশির ভাগ কারখানাই রয়ে গেছে। বিপজ্জনক রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা এলাকাজুড়ে। চানখাঁরপুল, সুরিটোলা, সিদ্দিকবাজার, আগামসি লেন, মালিটোলা, শাঁখারীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো পলিথিন, জুতা, পিভিসি পাইপ, প্লাস্টিক ও মশার কয়েলের কারখানা রয়েছে। অনেক ভবনের নিচেই রয়েছে বিপজ্জনক রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম। স্থানীয় বাড়িওয়ালারা বাড়তি ভাড়ায় গোপনে এসব কারখানার জন্য ভাড়া দিচ্ছেন।

রাসায়নিক কারখানা উচ্ছেদে সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অভিযান নেই। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস প্রথম দিকে অভিযান পরিচালনা করলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের দিন কাটছে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্যত্র সরে যাওয়ার কথাও বলেন। ২০১০ সালে নিমতলী ট্র্যাজেডির পর অনেক ভাড়াটিয়া এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

চকবাজারের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, পুরান ঢাকার বাসিন্দা মানে মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস করা। যেকোনো সময় এখানে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ভাড়া কম, তাই অনেকে নিরুপায় হয়ে এখানে ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করছে।

এদিকে চকবাজারে বুধবার দিবাগত রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন জরুরি সভা ডাকেন। মতিঝিলে মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় রাসায়নিক কারখানা কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নিতে এত দেরি হওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পে গতি আনার তাগিদ দেন তিনি। এ জন্য ডিসি অফিস, ভূমি মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।



মন্তব্য