kalerkantho


৯ বছর না যেতেই একই ট্র্যাজেডির দায় কার?

দায়িত্বপ্রাপ্তরা হাত গুটিয়ে আইনেরও প্রয়োগ নেই

আশরাফ-উল-আলম ও এম বদি-উজ-জামান   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



দায়িত্বপ্রাপ্তরা হাত গুটিয়ে আইনেরও প্রয়োগ নেই

পুরান ঢাকার নিমতলীতে ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে ভয়াবহ আগুনে ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল মূলত রাসায়নিক দ্রব্যের অপরিকল্পিত গুদাম ও প্লাস্টিক কারখানার কারণে। ওই ঘটনার পর সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা রাসায়নিক দ্রব্যের অবৈধ গুদাম সরাতে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। নিমতলীর ঘটনার পর তদন্ত কমিটির সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি বিন্দুমাত্র। দেশে বিদ্যমান কারখানা আইন, পরিবেশ আইন, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, মাদকদ্রব্য আইনসহ সংশ্লিষ্ট কোনো আইনেরই প্রয়োগ নেই ওই সব অবৈধ গুদাম বা কারখানার ক্ষেত্রে।

নিমতলীর ঘটনার প্রায় ৯ বছর পরও পুরান ঢাকার কারখানাগুলো পরিচালনার কোনো নীতিমালা হয়নি। ওই দুর্ঘটনার পর রাজধানীর আবাসিক এলাকা থেকে অনুমোদিত রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা  সরিয়ে দিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি কমিটি এবং পরে তিনটি উপকমিটি করা হয়েছিল। আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নিতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল উপকমিটিগুলো। সুপারিশে উঠে এসেছিল এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, এসিড নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার তথ্য। কিভাবে অনুমোদন ছাড়াই বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ আমদানি, উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন ও বিক্রি হচ্ছে সেই বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। কিন্তু এখনো ওই এলাকার বিপজ্জনক স্থাপনাগুলো সরানো হয়নি। এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটার আভাস ছিল সুপারিশে। কিন্তু সব সুপারিশ অবজ্ঞা করা হয়েছে।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে উদাসীনতা বা শৈথিল্যের পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কোনো নির্দেশনাকে পাত্তাই দেয় না পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা। বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্য ব্যবসায়ীদের মনোভাবও দায়ী বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, এখানে অনেকের অবহেলা রয়েছে। আইন অনুযায়ী কারখানা পরিদর্শকের নিয়মিত পরিদর্শন করার কথা। সিটি করপোরেশন কিসের ভিত্তিতে ওই ভবন থেকে ট্যাক্স আদায় করে সেটি দেখার বিষয়। যদি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্যাক্স নিয়ে থাকে, তবে তারা শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেয়েছে কি না দেখার বিষয়। হয়তো

দেখা যাবে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে খুশি করার মাধ্যমে এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালানো হচ্ছে। এটি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। এ ছাড়া ভবন মালিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা হতে পারে, যেমনটি হয়েছে রানা প্লাজা ও তাজরীন গার্মেন্ট মালিকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তরাও মামলা করতে পারে। 

আবাসিক এলাকায় কোনো কারখানা বা গুদাম করা আইনত নিষিদ্ধ। আবার কোথাও এ ধরনের কারখানা স্থাপন করতে হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী রাসায়নিক আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা ও ব্যবহার করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিতে হয়। এরপর ছাড়পত্র নিতে হয় বিস্ফোরক পরিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের। গুদামের নকশা, আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সনদসহ কমপক্ষে ১৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়। অথচ পুরান ঢাকার বেশির ভাগ রাসায়নিক ব্যবসায়ীর একমাত্র সনদ সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স।

১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের (সংশোধিত ২০১০) ৬ ধারায় অবৈধভাবে গুদামজাত, বাজারজাতকরণের সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। পুরান ঢাকায় বিভিন্ন গুদামে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কিটোন, আইসোপ্রপাইল, টলুইনের মতো রাসায়নিকসহ প্রসাধনী ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল রাখা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন এসিড, মাদকদ্রব্য তৈরির কাঁচামালও সংরক্ষণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ছাড়পত্র না নিয়ে ওই সব ব্যবসা করা হয়। বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করতে কারখানাও গড়ে তোলা হয়েছে নবাব কাটরা, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, চকবাজার, লালবাগ, বংশালসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। ১৯৬৫ সালের কারখানা আইনের তোয়াক্কাও করে না ওই এলাকার ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে ব্যবস্থাও নেয় না সংশ্লিষ্ট সংস্থা।

অনুমতি ছাড়াই পুরান ঢাকায় কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় অভিযুক্ত হতে পারেন সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় দায়িত্বে অবহলোর দায়ে তাদের বিচার করার বিধান আছে। কিন্তু দেশে এত বড় দুর্ঘটনার পরও কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে আইনের মুখোমুখি করা হয়নি। রাজউক, ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করছে না। মাঠপর্যায়ে তাদের তদারকিও নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি কারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার যেসব উপাদান থাকতে হবে বা যেসব শর্ত পালন করতে হবে, তা পালন না করলে দায়িত্বে অবহেলার দোষে দোষী হতে হবে। আর ওই সব প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করছে কি না, তা তদারকির দায়িত্ব যাদের তারা যদি সেই কাজ না করে থাকে, তাহলে তারাও সমান অপরাধে দোষী হবে। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করাও দায়িত্বে অবহেলা। ওই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে আবার দুর্ঘটনা ঘটত না।

মানা হয়নি হাইকোর্টের নির্দেশও : পুরান ঢাকার বাসাবাড়ি থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু তা-ও বাস্তবায়িত হয়নি। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কয়েকটি সংগঠনের করা এক রিট আবেদনের পর ২০১০ সালের জুনে হাইকোর্ট পাঁচ দফা নির্দেশা দিয়েছিলেন। এতে পুরান ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প, কলকারখানা ও রাসায়নিক গুদাম সরানোর নির্দেশ ছিল। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এবং একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো নির্দেশই কার্যকর হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানার মালিকরা আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে খুবই প্রভাবশালী। বিভিন্ন সংস্থাকে প্রভাবিত করে তারা কারখানা ও গুদাম বহাল রেখেছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের কালের কণ্ঠকে বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির আগে থেকেই পবা পুরান ঢাকার বাসাবাড়ি থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু ওই আন্দোলনের সঙ্গে সরকার একমত হলেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পেরে উঠছে না। তিনি বলেন, বাড়ির মালিকরা খুব প্রভাবশালী। বিভিন্ন সংস্থাকে ম্যানেজ করে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশও বাস্তবায়িত হচ্ছে না বিভিন্ন প্রভাবে। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর যৌথভাবে ১৮০টি গুদাম ও ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ২০১০ সালের অক্টোবরের মধ্যে গুদামগুলো সরানোর নির্দেশ দেওয়ার পরও সরানো হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, কিছু মালিক গুদাম সরিয়ে নিয়েছে। বাকিরাও সরে যাবে। তবে এখন চিরুনি অভিযান চালানো হবে।



মন্তব্য