kalerkantho


আইনজীবীদেরও এগিয়ে আসা উচিত

এ বি এম খায়রুল হক

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আইনজীবীদেরও এগিয়ে আসা উচিত

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। পৃথিবীর আর কোনো দেশে আমাদের মতো মাতৃভাষা রক্ষা করতে বুকের রক্ত দিতে হয়নি। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও ছয় দফা দাবির সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল হলো স্বাধীনতা সংগ্রাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা মূলত বাংলা ভাষা রক্ষা আন্দোলনের সোনালি ফসল। তাই বাংলা ভাষার মর্যাদা আরো সমুন্নত করতে দেশের উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে সর্বত্র এই ভাষার প্রচলন সময়ের দাবি।

আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনের বিষয়ে কথা উঠলে গণমাধ্যম সব সময় উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারকদের ওপরই বেশি করে দায়িত্ব অর্পণ করে এবং সময়ের দাবি গ্রহণ করে দেরিতে হোক আর ধীরে ধীরে হোক, অনেক বিচারক সব সময় না হলেও মাঝে মাঝে বাংলা ভাষায় রায় দিচ্ছেন। আমি যত দূর জানি, বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন সব সময়ই বাংলায় রায় দেন এবং বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালও অনেক রায় বাংলায় দিয়েছেন। এ ছাড়া আরো কয়েকজন বিচারক বাংলা ভাষায় রায় দিয়ে থাকেন। আগে একেবারেই কেউ দিতেন না, এখন অনেকেই দেওয়া আরম্ভ করেছেন। আশা করব আরো অনেকেই বাংলা ভাষায় রায় দেবেন।

আগে যে সমস্যাটা ছিল, সেটি কিন্তু এখন অপসারিত হয়েছে। আগে হাইকোর্ট রুলসে বলা ছিল যে ‘হাইকোর্টের ভাষা হলো ইংরেজি’। সে কারণেই আমি নিজে বাংলা ভাষায় রায় দেওয়ার আগে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছিলাম। তারপর অনেকটা মরিয়া হয়েই যত দূর মনে পড়ে ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমি বাংলা ভাষায় রায় দেওয়া শুরু করি। তখন থেকেই হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে অসংখ্য রায় বাংলায় দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। তবে বিচারপ্রার্থীর জরুরি অবস্থা বিবেচনা করে, যাতে দ্রুত প্রতিকার পায় সে জন্যই কিছুসংখ্যক রায় ইংরেজি ভাষায় দিতে হয়েছিল।

যে বিষয়টা কেউ বলেন না, লালসালুর একদিকে বিচারকরা আরেক দিকে আইনজীবীরা অবস্থান করেন। অধস্তন আদালতে যদিও আইনজীবীরা আরজি, জবাব বাংলা ভাষায় লিখে থাকেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা কেউই তাঁদের আবেদনপত্র বা আপিলের মেমো কোনো কিছুই বাংলা ভাষায় লেখেন না। এখন পর্যন্ত একটি বাদে আর কেউ লিখেছেন বলে আমার মনে পড়ে না। একটি বাদে কথাটা বলছি এ কারণে যে, সম্ভবত ২০০৯ সালে একজন বিজ্ঞ আইনজীবী হাইকোর্টে আমার বেঞ্চে কাঁদো কাঁদো হয়ে অ্যাপিয়ার করে বললেন, তিনি তাঁর রিট পিটিশনটি হাইকোর্টের অন্য একটি বেঞ্চে মুভ করতে চেয়েছিলেন (আমার চেয়ে সিনিয়র বেঞ্চে)। যেহেতু বাংলা ভাষায় ওনার পিটিশনটি লেখা ছিল, মাননীয় বিচারপতি তাই আবেদনপত্রটি ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। আমি সেই আবেদনপত্রটি আমার কোর্টে দাখিল করতে অনুমতি দিই। আবেদনপত্রটি বাংলায় লেখার জন্য ওই আইনজীবীকে আমি প্রশংসাও করি এবং বলি, আপনি নিজে অন্য আইনজীবীদের বাংলায় আবেদন করতে উদ্বুদ্ধ করেন, মেমো, আপিলসহ সব কিছু বাংলায় করার জন্য সবাইকে বলেন। একটি বেঞ্চের মাননীয় বিচারকের আবেদনপত্র ছুড়ে ফেলে দেওয়ার ওই বিষয়টি আমার মনে বড় দাগ কাটে। যখন আমি হাইকোর্ট রুলস কমিটির জ্যেষ্ঠতম সদস্য হিসেবে সুযোগ পাই, তখন আমি হাইকোর্ট রুলসে হাইকোর্টের ভাষা প্রশ্নে ইংরেজির সঙ্গে বাংলা সংযুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, যদিও উচ্চ আদালতের সঙ্গে এখন আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই, সরাসরি আমি জানিও না কে কোন ভাষায় লেখেন। আমি যত দূর জানি সব আইনজীবী এখনো এমনকি এই ভাষার মাসেও বাংলা ভাষা বাদ দিয়ে সেই ব্রিটিশদের ভাষায়ই আবেদনপত্রসহ আনুষঙ্গিক সব ইংরেজি ভাষায় করছেন। তাঁরা যদি অনুগ্রহ করে তাঁদের আবেদনপত্রসহ সব কিছু বাংলা ভাষায় করতে পারেন, তাহলে যেসব মাননীয় বিচারক বাংলা ভাষায় রায়/আদেশ লিখতে চান বা লেখেন, তাঁদের জন্য বাংলায় রায় দেওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে। কালের কণ্ঠ’র মাধ্যমে আমার বিনীত নিবেদন থাকবে সকল আইনজীবীর কাছে, আগামীকাল নয়, আজ থেকেই আপনারা আপনাদের আবেদনপত্রগুলো বাংলা ভাষায় লেখা আরম্ভ করেন। আজ থেকেই সর্বোচ্চ আদালত থেকে নিম্নতম আদালত পর্যন্ত সর্বত্র আপনারা বাংলা ভাষায় বলতে আরম্ভ করেন, লিখতে আরম্ভ করেন। আপনাদের যে প্রার্থনাগুলো আপনারা করতে আদালতে যাচ্ছেন, সেগুলোও বাংলা ভাষায় লেখেন।

একটি প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিতে চাই, যে ব্রিটিশরা আমাদের দেশে দীর্ঘ দুই শ বছর শাসন করেছে, তাদের দেশেই আদালতে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। মধ্যযুগে ব্রিটেনের আভিজাত লোকজন ও রাজদরবারের ভাষা ছিল ফরাসি আর আদালতের ভাষা ছিল লাতিন। এ কারণেই শেকসপিয়ারের নাটকগুলোর মধ্যেও লাতিন ভাষার প্রাচুর্য অনেক বেশি। এখন আমরা যে রকম আমাদের লেখালেখি ও কথা বলার মধ্যে ইংরেজি ভাষা বলে গৌরব অনুভব করি, সে আমলে কিন্তু ব্রিটিশরাও লাতিন না লিখলে তাকে খুব উচ্চমার্গের লেখক বলে গণ্য করা হতো না। সাধারণ ও কৃষক শ্রেণির মানুষ কথা বলত তাদের মাতৃভাষা ইংরেজিতে। অর্থাৎ ইংরেজি ছিল একেবারেই চাষাভুষার ভাষা। কোনো ভদ্র ব্রিটিশ তখন ইংরেজি ভাষায় কথা বলত না। তাদের ভাষা ছিল ফরাসি। ব্রিটিশ পণ্ডিতদের ভাষা ছিল লাতিন। সেই জায়গা থেকে সাহসী ইংরেজ আইনজীবীরা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসেন এবং ইংরেজিতে আবেদন করা আরম্ভ করেন। সব শেষে বিচারকরাও (ধীরে ধীরে হলেও) ইংরেজি ভাষায় রায় দেওয়া শুরু করেন। তখনও ইংরেজি ভাষাকে নিম্ন শ্রেণির বলেই গণ্য করা হতো। ধীরে ধীরে সেই ভাষায় বড় বড় সাহিত্য হলো, অনেক পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা হতে শুরু করল। ইংরেজরা সারা পৃথিবী দখল করে বসল। সেই সঙ্গে তাদের ভাষাও সর্বত্র নিয়ে গেল। এখন ইংরেজি ছাড়া বিশ্বের কোথাও আমাদের চলে না।

বাংলা ভাষারও অনেক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বাংলা ভাষায়ও সাহিত্য, কবিতা, প্রবন্ধ, মহাকাব্য সবই রচিত হচ্ছে। যদি আমরা মেঘনাদবধ কাব্য ধরি, এটি সম্ভবত বাংলা ভাষার প্রথম মহাকাব্য। যদি বিষাদসিন্ধুর কথা বলি, সেটিও একটি বিশাল মহাকাব্য। কায়কোবাদের মহাশ্মশান, সেটিও অনেক বড় মহাকাব্য। কাজেই আমরা এগোচ্ছি। আমরা আরও এগোতে পারব, বাংলাকে সর্বত্রকরণের দিকে যদি আমরা নজর দিই। আমি নিজেও ১৯৭০ সাল থেকে ২৮ বছর আইনজীবী ছিলাম, তাই আমার অনুরোধ থাকবে আইনজীবী ভাইদের প্রতি, আজ থেকেই তাঁরা যেন বাংলা ভাষায় আবেদনপত্র লেখা শুরু করেন। তাঁরা লেখা শুরু করলেই দেখবেন যে মাননীয় বিচারকরাও বাংলা ভাষায় রায় প্রদানে উৎসাহবোধ করছেন। বিচারকদের রায় লেখার জন্য অনেক কিছুই বিশেষ করে আদালতে আইনজীবীর সাবমিশনের অনেক কিছুই ওই আবেদনপত্র থেকে নিতে হয়। সেই আবেদনপত্রটা যদি ইংরেজিতে থাকে, সেই ইংরেজি থেকে মনে মনে হলেও বাংলা অনুবাদ করে, তাঁদের রায় দিতে হয় বাংলা ভাষায়। সেখানেই সমস্যাটি তৈরি হয়। কিন্তু আপনারা যদি প্রাঞ্জল ও বোঝার মতো বাংলা ভাষায় লেখেন, তাহলে এক নম্বর সুবিধা আপনার মক্কেল সহজে বুঝতে পারল। দুই নম্বর সুবিধা হলো, মাননীয় বিচারক যদি চান বাংলা ভাষায় রায় দিতে, উনিও স্বাচ্ছন্দ্যে বাংলায় রায় দিতে পারবেন। দুই পক্ষ না হলে বিচারালয় চলে না। কাজেই দুই পক্ষই এগিয়ে এলে বাংলা ভাষায় রায় দেওয়া সুবিধাজনক হবে।

তবে এ প্রসঙ্গে আমি আরেকটি কথা বলি, বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন অর্থ এই নয় যে ইংরেজি ভাষাকে আমরা নির্বাসনে পাঠিয়ে দেব। ইংরেজি ভাষা শেখার প্রয়োজন আছে। কারণ, সারা বিশ্বে ইংরেজি ভাষা এখন সর্বজন স্বীকৃত। ইংরেজি ভাষায় লিখিত গ্রন্থ ও প্রবন্ধসমূহ থেকে জ্ঞান আহরণ করে বাংলায় লিখিত রায়ের উৎকর্ষ সাধন বিশেষ প্রয়োজন।

বাংলা ভাষায় উচ্চ আদালতে রায় দেওয়া গর্বের বিষয়—এটি সত্য। তবে বাংলায় রায় দিতে হলে ওই রায়টা প্রকাশের আগে বারবার সংশোধন করা কঠিন ব্যাপার। এ জন্য যেটা দরকার, হাইকোর্টের বেঞ্চ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য লজিস্টিকস সরবরাহ করা। তবে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আজ হোক কাল হোক, সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগসহ দেশের সব আদালতের মাননীয় বিচারকরা বাংলা ভাষায় রায় লিখবেন।

লেখক : আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি

অনুলিখন : রেজাউল করিম

 



মন্তব্য