kalerkantho


বুড়িগঙ্গাপারের দখল উচ্ছেদে হোঁচট

ফোন পেয়ে ফেরত, আজ ফের অভিযান!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ফোন পেয়ে ফেরত, আজ ফের অভিযান!

রাজধানীর বসিলায় বুড়িগঙ্গা নদীতীরে কয়েক একর জমির মাঝখানে বাঁশ-খুঁটির সঙ্গে একটি সাদা সাইনবোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে, ‘ক্রয়সূত্রে এই জমির মালিক মো. রকিবুল আলম দীপু, চেয়ারম্যান, এসএস রহমান গ্রুপ, মোবাইল নম্বর ০১৭১১৫৪৪৫২৬।’ এই জমিতে গড়ে ওঠা একটি ১০ তলা ভবনসহ অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা গতকাল মঙ্গলবার উচ্ছেদ করতে গিয়ে বাধা পেয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)। এ সময় বিআইডাব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন এবং বিআইডাব্লিউটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমানকে মোবাইল ফোনে চাপ প্রয়োগ করে উচ্ছেদ অভিযান থেকে সাময়িক সরিয়ে নেওয়া হয়। বিকেলে সরেজমিনে উচ্ছেদ অভিযানে থেকে এমন তথ্য পাওয়া যায়।

তবে সাইনবোর্ডে লেখা নম্বরে যোগাযোগ করা হলে রকিবুল আলম দীপু গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি ওই সাইনবোর্ডের কথা জানেন না। নদীতীরে তাঁর কোনো জমিও নেই। আমিন- মোমিন হাউজিংয়ে তিনি কখনো কোনো জমি কেনেননি।

এমনকি নদীর জমি দখলও করেননি। তিনি দাবি করেন, কেউ হয়তো তাঁর নাম ব্যবহার করে নদীর জমি দখল করতে আমিন-মোমিন হাউজিংয়ের সাইনবোর্ড টানিয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে রকিবুল আলম দীপু বলেন, ‘আমার (দীপু) বাবা ক্যান্সারের রোগী। আমি বাবাকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুরে আছি। বাবার কেমো চলছে। বুড়িগঙ্গায় আমার কোনো জমি নেই। আমি কখনো বুড়িগঙ্গার জমি দখল করিনি।’ তিনি অনেকটা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা কিভাবে সম্ভব। আমার নাম, আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ও আমার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে নদীর জায়গা দখল করা হয়েছে অথচ আমি জানি না!’

তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের বসিলায় বুড়িগঙ্গা নদীর এই জায়গাটায় নদীর বেশির ভাগ অংশ প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। আমিন-মোমিন হাউজিং প্রপার্টির পাশাপাশি সেখানে নদীর দখল করে ইটের ভাটাও তৈরি করা হয়েছে। নদী প্রায় উধাও। এমনকি খালের সঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে আরো দেখা যায়, ওই হাউজিং প্রপার্টিতে বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়েছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)। অভিযান শুরু হতেই বাধার সম্মুখীন হয় বিআইডাব্লিউটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ তাঁর সঙ্গে থাকা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। উচ্ছেদ অভিযানের একপর্যায়ে তারা মোবাইল ফোনে চরমভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার এই ব্যস্ততার মধ্যেই এর মধ্যেই ছোট-বড় আরো অনেক স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধই করে দেয় বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।

চলমান এ অভিযান অসাপ্ত রেখে সরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে অভিযানে নেতৃত্বদানকারী বিআইডাব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, ‘অভিযান শুরুর একপর্যায়ে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান আজকের মতো (মঙ্গলবার) বন্ধ করতে। তাই আমি চলে যাচ্ছি’। এ সময় কার নির্দেশে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করা হয়—জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, পরিচালক বন্দরের নির্দেশে অভিযান বন্ধ করা হয়েছে।

অভিযান চলাকালেই আকস্মিক তা স্থগিত করা প্রসঙ্গে বিআইডাব্লিউটিএ থেকে সদ্য বদলি হওয়া চেয়ারম্যান কমোডর মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নবাগত চেয়ারম্যান কাল (আজ বুধবার) থেকে কাজ শুরু করবেন, তবে এই কয় দিন আমিই অভিযানের বিষয়ে দেখভাল করছিলাম। সেই সূত্রে আজ (গতকাল) অভিযান শুরুর একপর্যায়ে আমরা জানতে পারি আমিন-মোমিন গ্রুপের জমি নিয়ে হাইকোর্টে রিট রয়েছে। অন্যদিকে ১০ তলা ভবনটিও আমাদের নদীর সীমানার ভেতর নয়, সেটি রাজউকের আওতায়। ফলে ওই দুটি বিষয় সুরাহা না করে তা ভাঙা আইনগতভাবে আমাদের ঠিক হবে কি না, সেটা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অভিযানে থাকা টিমকে ফেরত আনা হয়েছে। তবে অভিযান বন্ধ হয়নি। বুধবার সকাল থেকেই যথারীতি আবার অভিযান শুরু হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডাব্লিউটিএর অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযান বন্ধ করা হয়নি, বুধবার ফের অভিযান চলবে। কাউকে প্রত্যাহার করা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, অভিযানের সময় আমিন-মোমিন হাউজিং প্রপার্টির লোকজন দাবি করেছিল যে তাদের জমির বৈধ কাগজপত্র আছে। তা ছাড়া নদীর সীমানা পিলার নিয়েও তারা আপত্তি তোলে। এ কারণে অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ আপাতত অভিযান স্থগিত করে চলে আসতে বলা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতেই ফের অভিযান চলবে।

অভিযানের ১১ দিনে গতকাল সকাল ১০টার দিকে বসিলা ব্রিজের উত্তর অংশ থেকে এই অভিযান শুরু হয়। এরপর সেখানে ১২টি পাকা ও আধাপাকা ভবন উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় নদীতীরে থাকা টিনশেড ঘর উচ্ছেদ করা হয়। এরপর বিকেল ৩টার দিকে বসিলা এলাকার আমিন-মোমিন হাউজিংয়ে অভিযান শুরু করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাউজিংয়ের মাঝখান দিয়ে একটি সড়ক চলে গেছে। পাশেই সড়কলাগোয়া নদীর সীমানা পিলার। পাশে ছোট ছোট টিনশেড ঘর। অভিযানের সময় এসব ঘরের বেশির ভাগ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমিন-মোমিন হাউজিংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জমির বৈধ দলিল আছে তাদের। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীর জমি দখল করেই এখানে হাউজিং প্রপার্টি গড়ে তোলা হয়েছে। আমিন-মোমিন হাউজিংয়ের ভেতরেই জমির মালিকানা দাবি করে একটি সাইনবোর্ড টানানো আছে। ওই সাইনবোর্ডে লেখা, ক্রয়সূত্রে এই জমির মালিক মো. রবিকুল আলম দীপু। চেয়ারম্যান এসএস রহমান গ্রুপ।

২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক বৈঠকে ঢাকার চারপাশের নদী ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ বন্ধ ও নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নদী রক্ষায় টাস্কফোর্স গঠন করে দেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ উচ্ছেদ কার্যক্রম চলছে। উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী গত সপ্তাহে সংসদে বলেন, এ অভিযান ঠেকাতে কারো প্রভাবই খাটবে না। বিআইডাব্লিউটিএ যে অভিযান শুরু করেছে, তা অব্যাহত থাকবে। গতকাল পর্যন্ত চলমান এ অভিযানে এক হাজার ৬৬০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের তথ্য পাওয়া গেছে।



মন্তব্য