kalerkantho


আইনজ্ঞের মত

তদন্ত শেষ না করার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়

খুরশীদ আলম খান

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



তদন্ত শেষ না করার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নয়, প্রতিটি হত্যার ঘটনা মানুষের কাছে হৃদয়বিদারক। আর মেধাবী সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ড আমাদের সমাজের সবাইকে নাড়া দেয়। এই সাংবাদিক দম্পতির ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল বলে এখন পর্যন্ত শোনা যায় না। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে কেন তাদের হত্যা করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর এখন শুধুই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথা এই হত্যাকাণ্ডের পর করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করছে। এই হত্যাকাণ্ড বা মামলা শুধুই সাংবাদিক সমাজের বিষয় নয়। অন্যান্য সাধারণ হত্যাকাণ্ডের মতো যদি চিন্তা করা হয় তাহলে বলতে হবে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হলে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। এটা যদি করা না যায় তাহলে জনগণের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। ঠিক তেমন ঘটনাই ঘটছে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে। এই হত্যাকাণ্ডের কোনো কূল-কিনারা হলো না আজও।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সব মহলেই নানা কথা শোনা যায়। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। সাংবাদিক সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনিকে তাঁদের নিজ বাসায় হত্যা করা হয়। অথচ এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও উদ্ঘাটন করতে পারেনি তদন্ত কর্মকর্তা তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্ত কর্মকর্তা বারবার আদালত থেকে সময় নিচ্ছেন তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য। আইন অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তার সময় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই বলে এমন একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে গড়িমসি? হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে কেন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে না তার একটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা থাকা দরকার। কর্তৃপক্ষকে এমন একটি ব্যাখ্যা দিতে হবে, যা সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এমন একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সঠিক পথে তদন্ত কর্মকর্তা চলছেন কি না, তা তদারকির জন্য, দেখার জন্য তদারকি কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে (সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড) আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থতার কারণেই এমন প্রশ্ন আসতে পারে সাধারণ মানুষের মনে।

যেকোনো ফৌজদারি মামলায় তদন্ত শেষে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র ও ফাইনাল রিপোর্ট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার বিধান রয়েছে। একবার তদন্ত শেষ হলে অধিকতর তদন্ত করারও সুযোগ রয়েছে আইনে। মামলায় কোনো নতুন আসামির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার সুযোগ রয়েছে। আইনে এই সুযোগ থাকার পরও কেন সাগর-রুনি হত্যা মামলায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হলে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব নয়—এমন কথা বলতে পারেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু আইনে যেখানে অধিকতর তদন্তের সুযোগ রয়েছে, সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে সাত বছরেও তদন্ত শেষ না করার কোনো যুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এ জাতীয় বিলম্বের কারণে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা নিয়ে, মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। মানুষ আশাহত হবে। মনে রাখতে হবে, একবার বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সাধারণ মানুষের কাছে বিচারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এ কারণেই মানুষের মনে কোনো প্রশ্ন ওঠার আগেই এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা প্রয়োজন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কোনো তথ্য না পেয়ে থাকে সেটাও জনগণের কাছে প্রকাশ করা উচিত। আর যদি কোনো সাফল্য থেকে থাকে, মামলার স্বার্থে তথ্য প্রকাশ না করেও শতকরা কত ভাগ কাজ শেষ হয়েছে তাও বলা প্রয়োজন। যেহেতু আইনে সম্পূরক তদন্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র দেওয়ার সুযোগ রয়েছে সে কারণে এই হত্যাকাণ্ডে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে সেটুকু নিয়েই অভিযোগপত্র দেওয়া উচিত। কারণ পরে কোনো আসামির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া যাবে। যেমন বহুল আলোচিত একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলা, চট্টগ্রামের দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এ রকম অসংখ্য মামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার নজির রয়েছে।

আইনে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করার সুযোগ থাকার পরও অভিযোগপত্র দাখিল না করায় একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি বিচলিত। সাত বছরেও এমন একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের কূল-কিনারা না হওয়ায় বিষয়টি আমাকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এর ফলে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আদৌ ভবিষ্যৎ আছে কি না?

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী এবং ঢাকা ল রিপোর্টের সম্পাদক



মন্তব্য