kalerkantho


আজীবন হাসবে ওরা!

তৌফিক মারুফ   

২১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আজীবন হাসবে ওরা!

গত রাতে হাঙ্গেরির হাসপাতাল থেকে তোলা রাবেয়া-রুকাইয়ার ছবি

রাবেয়া-রুকাইয়া। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সেই জোড়া মাথার দুই শিশু। চলাফেরার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেমন উচ্ছল, তেমনি প্রাণবন্ত। নিজেদের মধ্যে মেতে আছে আনন্দময় দুষ্টুমিতে। মান-অভিমানও কম নয়। একজন ঘুমালে তো আরেকজন রাতজাগা। দুজনে আলাদা হয়ে নতুন জীবনে ফিরতে এখন তাদের নোঙর সুদূর হাঙ্গেরিতে। নতুন অবয়ব তারা পাবে কি না সেটার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে আজ সোমবার। হাঙ্গেরি যাওয়ার পর যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে সেগুলোর সমন্বিত চূড়ান্ত মেডিক্যাল প্রতিবেদন আজ হাতে পাবেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। ওই প্রতিবেদনের ইতিবাচক ফলের ওপর ভর করে আজ-কালের মধ্যেই তাদের অপারেশনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে। যদি প্রতিবেদনের ফলে শিশু দুটিকে আলাদা করার পক্ষে উপযুক্ত সায় না মেলে তাহলে তারা আর আলাদা হতে পারবে না—যেভাবে আছে সেভাবেই তাদের বেঁচে থাকতে  হবে আজীবন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে রাবেয়া-রুকাইয়াকে আলাদা করতে সহায়ক চিকিৎসার জন্য গত ৫ জানুয়ারি তাদের হাঙ্গেরি পাঠানো হয়। তাদের সঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল দল সেখানে গেছে। বর্তমানে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে স্যামওয়েলস মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রয়েছে রাবেয়া ও রুকাইয়া।

রাবেয়া-রুকাইয়ার সঙ্গে থাকা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সহকারী অধ্যাপক ও বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. হোসাইন ইমাম গতকাল রবিবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, আজ সোমবার রাবেয়া-রুকাইয়ার এমআরআই ট্র্যাক্টোগ্রাফির প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এই প্রতিবেদনের ওপরই তাদের সারাজীবনের সুখ-দুঃখ নির্ভর করছে। যদি ওই প্রতিবেদন থেকে তাদের প্রাণে বাঁচিয়ে আলাদা করার উপযুক্ত নির্দেশনা পাওয়া যায় তবে আজ-কালের মধ্যেই পরবর্তী অপারেশনের দিনক্ষণ ঠিক হতে পারে। এ অপারেশনের মাধ্যমে ওদের মাথার চামড়া বাড়ানোর জন্য তিনটি বিশেষ এক্সপান্ডার বসানো হবে। এক্সপান্ডারগুলো আগামী তিন থেকে চার মাস আস্তে আস্তে ফুলানো হবে, যাতে ওদের আলাদা করার পর মাথা দুটোর বিরাট ক্ষতগুলো ওই চামড়া দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। তবে তাদের চূড়ান্তভাবে আলাদা করার অপারেশন বাংলাদেশেই করা হবে। হাঙ্গেরিতে শুধু এর আগের বিভিন্ন ধাপগুলো শেষ করা হবে। এ জন্য প্রায় চার মাস তাদের এখানে থাকতে হবে।

ডা. হোসাইন ইমাম জানান, রাবেয়া-রুবাইয়ার সঙ্গে তাদের মা-বাবা, বড় বোন এবং চিকিৎসকদলের প্রতিনিধিদের মধ্যে তিনিই (ডা. হোসাইন ইমাম) সঙ্গে গেছেন। শিগগির বাংলাদেশ থেকে আরো কয়েকজন প্রতিনিধি হাঙ্গেরি আসবেন।

এদিকে হাঙ্গেরিভিত্তিক সংগঠন—নিরাপত্তাহীন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ বাংলাদেশি আরো কয়েকটি প্রবাসী সংগঠন শিশু দুটির সেবাযত্নে এগিয়ে এসেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হাঙ্গেরির বাংলাদেশ দূতাবাস প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো দেখভাল করছে। আর বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট মুখ্য

ভূমিকা পালন করছে। এর আগে জোড়া মাথার শিশু দুটিকে হাঙ্গেরিতে নেওয়ার পর তাদের হাঙ্গেরি সরকারের সহায়তায় স্যামোয়েলস মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। পরে গত ১৪ জানুয়ারি তাদের এমআরআই ট্র্যাক্টোগ্রাফি করা হয়। যেখানে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ২৫ জনের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক-প্রযুক্তিবিদ সমন্বিতভাবে কাজ করেন। যার প্রতিবেদন আজ বাংলাদেশ সময় সকাল নাগাদ পাওয়া যাবে। বিশেষ করে এমআরআই ট্র্যাক্টোগ্রাফিতে শনাক্ত করা যায় শিশু দুটির মস্তিষ্কের ভেতরে বিভিন্ন টিস্যুসহ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নানা শিরা-উপশিরার অবস্থানগত চিত্র এবং সেসব শিরা-উপশিরার কার্যকরিতা। সেই সঙ্গে কোন কোন শিরা-উপশিরা বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব, কোনটি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়, কোনটি বিচ্ছিন্ন করলে প্রাণহানির কোনো শঙ্কা থাকবে না ইত্যাদি বিষয়।

ডা. হোসাইন ইমাম জানান, প্রতিবেদন পাওয়ার পর যদি দেখা যায় শিশু দুটিকে বিচ্ছিন্ন করলে তারা অন্ততপক্ষে প্রাণে বেঁচে থাকবে তবেই অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর যদি দেখা যায় প্রাণহানির শঙ্কা বেশি তবে আর তাদের আলাদা করার ঝুঁকি নেওয়া হবে না।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১৬ জুন পাবনার চাটমোহরের আটলংকা গ্রামের স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম ও তাসলিমা দম্পতির কোলজুড়ে আসে জোড়া মাথার দুই শিশু রাবেয়া ও রুকাইয়া। যাদের শরীর ও অন্যান্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক দুজন মানুষের থাকলেও শুধু মাথা একটি। জন্মের পর থেকে দফায় দফায় তাদের চিকিৎসা করা হয়। শিশু দুটিকে আলাদা করার জন্য দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এগিয়ে এসেছেন শিশু দুটিকে নতুন জীবন দিতে। এরই ধারাবাহিকতায় অপারেশনের মাধ্যমে তাদের আলাদা করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।

 



মন্তব্য