kalerkantho


জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে দুই মত বিএনপিতে

শফিক সাফি   

২১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে দুই মত বিএনপিতে

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘ভরাডুবির’ পর দল পুনর্গঠন জরুরি বলে মনে করছে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। এই পরিস্থিতিতে দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। নতুন করে কাউন্সিল হবে, নাকি ষষ্ঠ কাউন্সিলের শূন্য থাকা পদগুলো পূরণ করা হবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে।

দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশ (ডানপন্থী) মনে করছে, তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। পাশাপাশি এখনই আন্দোলনে না গিয়ে সারা দেশে গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্ত করে আনা। এই ফাঁকে পুনর্গঠনের কাজটি সেরে ফেলা।

এ অংশের জোরালো বক্তব্য হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে মুক্ত না করে কোনোভাবেই কাউন্সিল আয়োজন করা ঠিক হবে না। বর্তমানে জাতীয় নির্বাহী কমিটির শূন্য থাকা পদগুলো আগে পূরণ করা হোক। পরে সঠিক ও সুবিধাজনক সময়ে কাউন্সিল আয়োজন করা যেতে পারে।

তবে জ্যেষ্ঠ নেতাদের আরেক অংশের (উদারপন্থী) মত হচ্ছে, প্রথমেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে বসে তাঁদের মতামত শুনে একটি সারসংক্ষেপ করা উচিত। পরে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা আহ্বান করে নেতাদের মত নেওয়া উচিত। এর পরপরই জাতীয় সম্মেলনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তৈরি হওয়া দরকার।

যদিও কাউন্সিল বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতা এখনো কোনো মতামত দেননি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান নিজেই এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এরই মধ্যে তিনি বিভাগওয়ারি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। স্কাইপেতে এতে যুক্ত হবেন তারেক রহমান।

দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য কালের কণ্ঠকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, চলতি সপ্তাহ থেকে এ বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

জানা গেছে, দল পুনর্গঠনের দাবি উঠলেও তা কিভাবে শুরু হবে, সেটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের চাহিদার আলোকে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে বার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা পরামর্শ আসার আগ পর্যন্ত নতুন সিদ্ধান্তগ্রহণ থেকে বিরত রয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। অন্তত আগামী ছয় মাস তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক নির্দেশনা পর্যবেক্ষণ করার কথা ভাবছেন তাঁরা।

গত মঙ্গলবার রাতে গুলশানে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের কাউন্সিলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে দলের উদারপন্থী বা ডানপন্থী কোনো পক্ষই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেনি, যদিও ডানপন্থীরা আগে বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়ে জোর দিতে বলেছেন।

গত শুক্রবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনাসভায় দল পুনর্গঠন নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপির উদারপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

মোশাররফ বলেছেন, ‘একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। তুলনামূলকভাবে ত্যাগী, এই নির্বাচনে যারা পরীক্ষিত, সেসব নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে আনতে হবে।’

মওদুদ বলেছেন, দল পুনর্গঠনের কাজ কয়েক মাসের মধ্যেই করতে হবে।

তবে কালের কণ্ঠ’র কাছে দুজনের কেউই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের অভিভাবক খালেদা জিয়া, আমাদের নেতা তারেক রহমান। তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটিই চূড়ান্ত।’

সর্বশেষ বিএনপির নির্বাহী কমিটির জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। সেটা ছিল ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাহী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এই কমিটিই দায়িত্ব পালন করবে।

জানা গেছে, সর্বশেষ কাউন্সিলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির পরিধি বাড়িয়ে উনিশে উন্নীত করা হয়েছিল। কিন্তু কাউন্সিলের পর পুনর্গঠিত কমিটিতে দুটি পদ ছিল শূন্য। ১৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির দুজন তারেক রহমান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ আইনি জটিলতার কারণে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন দেশের বাইরে। মূলত ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিই ছিল বিএনপি নীতিনির্ধারক ফোরামের। আবার এই ১৫ জনের মধ্যে বিগত পৌনে তিন বছরে তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ার মারা গেছেন। আসছে ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে এক বছর পূর্ণ হবে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। শারীরিক অসুস্থতার কারণে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বেশির ভাগ সভায় অংশ নিতে পারেন না। ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর পুনর্গঠিত কমিটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মধ্যে হারুন অর রশিদ খান মুন্নু, ফজলুর রহমান পটল, আকতার হামিদ সিদ্দিকী, সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম, সঞ্জীব চৌধুরী, গবেষণা সম্পাদক আবু সাঈদ খান খোকন, ধর্ম সম্পাদক বদরুজ্জামান খসরু, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে মোজাহার হোসেন, এম এ মজিদ, সরওয়ার আজম খান, আবুল কাশেম চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্তত অর্ধশতাধিক নেতা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে এখন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

সূত্রগুলো বলছে, ৩৭ জন ভাইস চেয়ারম্যানের মধ্যে কমিটি ঘোষণার পরপরই পদত্যাগ করেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। ইনাম আহমেদ চৌধুরী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র ও সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদ দুটি কমিটি ঘোষণার পরই ফাঁকা। নির্বাহী কমিটির সাতটি আন্তর্জাতিক সম্পাদকের মধ্যে দুটি ফাঁকা। সহ-যুববিষয়ক সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হলেও যুববিষয়ক সম্পাদকের পদটি এখনো ফাঁকা।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দলের হাই কমান্ডের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। আশা করি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা কাউন্সিল করতে পারব। বিষয়টি সম্পর্কে আরো পরিষ্কার হওয়া যাবে দলের সিনিয়র নেতারা কারাবন্দি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করার পর।’

জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করার জন্য চেষ্টা করছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা।

দলটির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে ৩০০ আসনে মামলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মামলা হয়ে গেলেই আমরা দলের পুনর্গঠনের ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণে বসব। আশা করি ওই মতামতের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাদের একটি দিকনির্দেশনা দেবেন।’

সঠিক সময়ে কাউন্সিল না করতে পারলে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘গঠনতন্ত্রের একটি অংশে রয়েছে—প্রাকৃতিক বা দুর্যোগকালীন সময়ে কাউন্সিল সময়মতো করতে না পারলে তা নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানাতে হবে। সেই আলোকে সিদ্ধান্ত নেব আমরা।’

বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বেশির ভাগই চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির মাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের বিকল্প দেখছেন না নেতাকর্মীরা। নেতারা বলেছেন, তাঁরা এ নিয়ে কাজ করছেন।



মন্তব্য