kalerkantho


মাদকবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী

সুস্থ জীবনে ফিরতে চাইলে সুযোগ দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সুস্থ জীবনে ফিরতে চাইলে সুযোগ দিন

দুর্নীতি, মাদক ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেছেন, যারা সুস্থ জীবনে ফিরতে চায়, তাদের জন্য সেই সুযোগও সৃষ্টি করতে হবে।

টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর পরিদর্শনের অংশ হিসেবে গতকাল রবিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি মন্ত্রণালয় ও  মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসারসহ বাহিনীগুলোর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

কর্মকর্তাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুর্নীতি দেশে কালব্যাধির মতো ছেয়ে আছে। এর গোড়াপত্তন পঁচাত্তরের পরের শক্তি করেছে। জঙ্গিবাদ সৃষ্টিতে ওই সময়কার সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। সমাজকে এই কালব্যাধি থেকে মুক্ত করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবাইকে কাজ করতে হবে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতির মতো কালব্যাধি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।’

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে একটা মাদকাসক্ত আছে, সে পরিবারের যে কী কষ্ট, সেটা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। সে কারণে অভিযানটাকে আমাদের আরো ব্যাপকভাবে পরিচালনা করে যেতে হবে।’

এ ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির খারাপ দিকটি মানুষের সামনে তুলে ধরে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে প্রচার চালানোর ওপর জোর দেন শেখ হাসিনা। অপরাধীরা কেন অপরাধে সম্পৃক্ত হয়, সেটা খুঁজে বের করার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র তাদের (অপরাধী) বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিলেই যে তারা ভালো হয়ে যাবে তা না; বরং তাদেরকে সমাজের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারাটাও কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’

সম্প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সুন্দরবনের জল ও বনদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এবং সরকারের তরফ থেকে তাদের পুনর্বাসনে সহায়তা করার কথাও এ প্রসঙ্গে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে অপরাধী আবার অপরাধের জীবনে ফিরে যায় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের যে অভিযান, সেটা অব্যাহত থাকতে হবে। সাথে সাথে মাদকমুক্ত করা, মাদক কারা আনে, পাচারকারী, কারা সেবন করে—এখানে কিন্তু বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা সুস্থভাবে সমাজে ফিরে আসতে চাইবে, সংসারে ফিরে আসতে চাইবে, তাদেরকেও সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।’

মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের অধিক নজর দেওয়ার জন্য তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মাদক শনাক্তকরণ মেশিন কেনার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া বেসরকারি মাদক নিরাময়কেন্দ্রগুলো কিভাবে চলছে তা নজরদারি এবং নিরাময়কেন্দ্রের সেবা বিস্তৃত করার পরামর্শ দেন। তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘সকল প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দরকার।’ পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা সৃষ্টির নির্দেশ দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ কী কী কাজ করেছে সে সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তাঁর বক্তব্যের পর একে একে বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা বক্তব্য দেন।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, আনসার বাহিনীর প্রধান প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান আনসার বাহিনী নামটি পরিবর্তন করার বিষয়ে। তিনি বলেন, নামটির কারণে বিদেশে বাহিনীটির নাম নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়। আনসার আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আনসার বাহিনী বহু পুরনো। নামটি পরিবর্তন করতে হলে মাঠপর্যায়ের আনসার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা রাজি হলে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

বৈঠকে পুলিশের চিকিৎসাসেবা নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দেন পুলিশ বাহিনীতে একটি মেডিক্যাল ইউনিট করার জন্য। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ফায়ারম্যান নামে অভিহিত করা হয়। এই নামটি পরিবর্তন করে অন্য কোনো নাম দেওয়া যায় কি না সেটি নিয়ে ভাবার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। সারা দেশে কারাগারগুলোতে ৭৫ হাজারের বেশি বন্দির জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র আটজন। কারাগারে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়নোর বিষয়ে মত দেন প্রধানমন্ত্রী।

সড়কে পথচারী ও চালকদের অসচেতনতা এবং অনিয়মতান্ত্রিক চলাচলে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি না, কেন আমাদের দেশের মানুষ নিজের নিরাপত্তাটা বোঝে না। ট্রাফিক জ্যাম একটা বিরাট সমস্যা, এতে কোনো সন্দেহ নাই। এখানে আমি যেটা লক্ষ করি, ট্রাফিক জ্যামের জন্য বা দুর্ঘটনার জন্য যারা আমাদের রাস্তায় চলাচল করে তারাও যেমন দায়ী, চালকরাও দায়ী। ফুট ওভারব্রিজ করা হয়েছে, ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে না গিয়ে কোথায় একটু ফাঁকফোকর সেখান দিয়ে যাওয়া।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা ছবি দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম। রাস্তায় বেড়া দেওয়া, সেখানে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। খোদা না করুক যদি ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেত তাহলে ওই বাচ্চা কিন্তু ওখানে মারা যাবে। তখন কাকে দোষ দেবে। অথবা গাড়ি আসছে, দিল মাঝখান দিয়ে দৌড়।’ তিনি আরো বলেন, ‘গাড়ি যাচ্ছে, মানুষ যাচ্ছে একসঙ্গে। তারপর দুর্ঘটনা হলে গাড়ি ভাঙো, ড্রাইভারকে মারো। ড্রাইভারকে মারতে মারতে খুনই করে ফেলে দেয়। সে জন্য ড্রাইভার থামেও না। একজন পড়ে গেল, তার পরও গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়া। এই বিষয়গুলো আমাদের ভালোভাবে দেখা উচিত।’

ট্রাফিক জ্যামকে বিরাট সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধামন্ত্রী বলেন, ‘সড়কে যানজট কমাতে ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের অর্থনীতি যত ভালো হচ্ছে, মানুষের সুযোগ-সুবিধাও বাড়ছে। গাড়ি কেনা ও মানুষের চলাচলও বাড়ছে। ট্রাফিক জ্যাম একটা বিরাট সমস্যা, এতে আমাদের কোনো সন্দেহ নাই। এ সমস্যার সমাধানে আরো আন্ডারপাস ও ফুট ওভারব্রিজ করতে হবে। সাধারণ মানুষ ও চালকদের সচেতন হতে হবে।’

সকাল ১০টা ৫ মিনিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। পরে তিনি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বৈঠক করেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান কর্মকর্তারা। দুপুর সোয়া ১টার দিকে মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগ জনগণের আস্থার মর্যাদা রাখবে : এদিকে পৃথক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ আওযামী লীগের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন তার মর্যাদা রক্ষা করা হবে।’ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি মর্যাদা দেখিয়ে অত্যন্ত ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে চলতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল সন্ধ্যায় গণভবনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে ব্যাপক উন্নয়নকাজ চলছে, এগুলো শেষ করতে হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন উন্নয়নকাজ শুরু করতে হবে।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতাদের নেতিবাচক মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া আসন থেকে তাঁকে পুনরায় নির্বাচিত করায় সেখানকার জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপস্থিত নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান।

 



মন্তব্য