kalerkantho


বড় দুর্নীতিবাজদের ধরতে দুদক নামছে চলতি মাসেই

হায়দার আলী   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বড় দুর্নীতিবাজদের ধরতে দুদক নামছে চলতি মাসেই

আর শুধু চুনোপুঁটি নয়, প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের ধরতে শিগগিরই মাঠে নামবে দুদক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তালিকা ইতিমধ্যে তৈরি করা শুরু করেছে। এমনকি তাঁদের স্ত্রী-সন্তানদের সম্পদেরও হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে দুদক। এমপি-মন্ত্রীদের হলফনামাও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, সেখানে অসংগতি পেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রভাবশালী এবং শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের ধরলেই দুর্নীতির চিত্র অনেকটা পাল্টে যাবে বলে মনে করছেন দুদক কর্মকর্তারা। দুদক সূত্র মতে, অভিযানের ব্যাপারে সরকারের ওপর মহল থেকে সবুজ সংকেত রয়েছে এবং বিশেষ লক্ষ্য সামনে রেখে  চলতি মাসেই বড় ধরনের অভিযান শুরু হচ্ছে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পরপরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকার ঘোষণা রয়েছে। দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এখন বড় ধরনের দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির মুখোমুখি করে সরকারের পাশাপাশি নিজেদের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করতে চায় দুদক। সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা আগের থেকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। কারণ, বর্তমান সরকারের ম্যান্ডেট ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। আমরা প্রত্যাশা করি সরকার আমাদের সকল প্রকার সহযোগিতা করবে।’ ওয়েবসাইট থেকে প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হলফনামা নিয়ে কী করব ১৫-১৬ জানুয়ারির পর দেখতে পারবেন। এখানে মন্ত্রীদের বর্তমান আর সাবেক বলে কথা নেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দুদক কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযান পরিচালনায় ইতিমধ্যে যুক্ত করা হয়েছে পুলিশের সশস্ত্র ইউনিট। গঠন করা হয়েছে চৌকস এনফোর্সমেন্ট টিম। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করতে এসব সশস্ত্র ইউনিট ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েছে।

দুদক কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু চুনোপুঁটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তো হবে না। এবারে আমাদের রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। যেখানে সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, সেখানে আমাদের কাজ অনেক বেড়ে যায়। মানুষ এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, আমরা যদি এখন এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারি তাহলে তা হবে আমাদের ব্যর্থতা। শিগগিরই পুরো কমিশন কঠিন সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা কাউকে আর ছাড় দিতে চাই না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিশিয়াল কাজের পরিধি ও লোকবল দ্বিগুণ করা হচ্ছে। এখন কাজের মাধ্যমে দক্ষতা ও আন্তরিকতা প্রমাণের সুযোগ এসেছে।’

তবে টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্নীতি দমন করতে গেলে আগে দরকার পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট। আর দুর্নীতি দমন করতে হলে অবশ্যই ওপর থেকে দুর্নীতিবাজদের ধরতে হবে। বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে হলে ছাপোষা কেরানিদের ধরে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা যাবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘নিজের আর পরের লোক বলে কথা নেই। দুর্নীতিবাজকে দুর্নীতিবাজ হিসেবেই চিহ্নিত করেই অভিযানে নামতে হবে।’ তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি, সচিব থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী নেওয়া যেতে পারে এবং ওই সব সম্পদ বিবরণী তালিকা ধরেও দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সম্পদের হিসাব নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিলে দুর্নীতি দমন করা যাবে না।

এবার নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ২১টি বিশেষ অঙ্গীকার ছিল। যার অন্যতম ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। যেখানে বলা হয়, ‘দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের প্রয়োগ মুখ্য হলেও তা শুধু সরকারের দায় নয়, জনগণেরও দায় রয়েছে। আমরা মনে করি, দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করা হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও তদারকি আরো জোরদার করবে।’

নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রায় সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। এমনকি ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদ চৌধুরী তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে জমা দিতে বলেছেন। এভাবে আরো কিছু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব নিয়ে কাজ করছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই বিভিন্ন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে কয়েক হাজার অভিযোগ এসেছে। ওই সব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এ ক্ষেত্রে অনেক কাজই এগিয়ে আনা হয়েছে। বেশ কয়েকটি তালিকা প্রস্তুত রয়েছে। ইতিমধ্যে হলফনামা যাচাই-বাছাই করে কয়েকজন প্রভাবশালীর ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে অবৈধ উৎস থেকে অর্জিত অর্থ বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

 

 



মন্তব্য