kalerkantho


বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি

ফিলিপাইনে আরসিবিসি ব্যাংকের মায়ার সাজা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ফিলিপাইনে আরসিবিসি ব্যাংকের মায়ার সাজা

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের তখনকার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস-দেগুইতোকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছেন দেশটির আদালত। বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কোটি ১০ লাখ ডলার অর্থপাচারের ঘটনায় মায়ার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি অপরাধে তাঁকে চার থেকে সাত বছরের কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন ফিলিপাইনের মাকাতির আঞ্চলিক আদালত। একই সঙ্গে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানা পরিশোধ করারও আদেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারক সিজার উনতালান এই রায় ঘোষণা করেন।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে হ্যাকাররা। এর মধ্যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার মাকাতি শাখার মাধ্যমে চলে যায় জুয়ার আসরে। বাকি অর্থ শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়ে দেওয়া হলেও সেই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক ফেরত পায়।

গতকাল মাকাতির আঞ্চলিক আদালত ২৬ পৃষ্ঠার রায়ে অর্থপাচারের ঘটনায় মায়া সান্তোস-দেগুইতোকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত বলেন, ওই ঘটনার সময় আরসিবিসি জুপিটার শাখার দায়িত্বে ছিলেন মায়া। সুতরাং অর্থপাচারের দায়ে অবশ্যই তিনি অপরাধী। তাঁর পক্ষ থেকে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি যা তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করে। চারটি অজানা ও কাল্পনিক হিসাবে কোটি ডলার অর্থ জমা এবং তা তুলে নেয়ার সুযোগ দিয়েছেন মায়া। এ অর্থ একটি রেমিট্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পেসোতে রূপান্তর করে জুয়ার বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।

আদালতের এ রায়ের পর দেগুইতোর আইনজীবী বলেছেন, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তাঁরা জানান, মায়া এখন গ্রেপ্তার হবেন না, কারণ তিনি জামিনে আছেন।

সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে (ফেড) রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। তিন বছর আগে ঝড় তোলা এই সাইবার চুরির ঘটনায় এই প্রথম কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হলো। আরসিবিসির তখনকার কর্মকর্তা দেগুইতো ছিলেন মামলার একমাত্র আসামি।

ফিলিপাইনে যাওয়া ওই অর্থ ফিলরেম মানি রেমিট্যান্স কম্পানির মাধ্যমে চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোর কাছে। জুয়ার টেবিলে হাতবদল হয়ে ওই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে, এর হদিস আর মেলেনি। এর মধ্যে একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও বাকি অর্থ উদ্ধারে এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইনে ঢোকার বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে দেশটির সিনেট কমিটি তদন্ত শুরু করে। ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার পর আরসিবিসি তাদের শাখা ম্যানেজর দেগুইতোকে বরখাস্ত করে। আর ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাপাচার ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় এক কোটি ৯১ লাখ ডলার জরিমানা করে আরসিবিসিকে।

তবে এরই মধ্যে ফিলিপাইনের জাস্টিস বিভাগ রেমিট্যান্স প্রতিষ্ঠান ফিলিপাইন রেমিট্যান্স লিমিটেডের (ফিলরেম) মালিক সালুড ও মিখায়েল বতিস্তা এবং ক্যাসিনো জাংকেট অপারেটর কিম ওয়াংকে খালাস দিয়েছে।

ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই সাইবার জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মানুষ বিষয়টি জানতে পারে ঘটনার এক মাস পর, ফিলিপাইনের একটি পত্রিকার মাধ্যমে। সে সময় বিষয়টি চেপে রাখায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল।

রিজার্ভ চুরির তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তারা যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও সেই প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জমা দেওয়ার জন্য গত বুধবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন ঢাকার একটি আদালত।

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা হচ্ছে : ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক ও নিউ ইয়র্ক ফেডের বিরুদ্ধে মামলা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডিসেম্বরেই এ মামলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। জাতীয় নির্বাচনের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। গত সোমবার বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দুই প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। সেখানে মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে একটি আইনি ফার্ম কাজ করবে। প্রতিনিধিদলে আছেন বিএফআইইউ প্রধান আবু হেনা মো. রাজী হাসান, পরামর্শক দেবপ্রসাদ দেবনাথ ও যুগ্ম পরিচালক মো. আবদুর রব। আগামী ২৫ দিনের বা ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করা হবে। তবে ১৫ জানুয়ারির আগেও মামলা হতে পারে। তথ্য সূত্র : ফিলস্টার, এবিএসসিবিএন নিউজ।

 

 



মন্তব্য