kalerkantho


সাক্ষাৎকার ► ড. রেজা কিবরিয়া অর্থনীতিবিদ

রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চাই

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চাই

অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া কম্বোডিয়া সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত আছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ম্যাক্রো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক নীতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিনি আওয়ামী লীগ আমলের (১৯৯৬-২০০১) অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন তাঁর বাবা। রেজা কিবরিয়া গতকাল রবিবার দুপুরে মতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে গিয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন গণফোরামে যোগ দেন। তিনি হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার জন্য গণফোরামের দলীয় মনোনয়ন ফরম জমা দেন তিনি। এ সময় সেখানে ছিলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। বিকেলে রেজা কিবরিয়া গুলশান-২-এ নিজের বাসায় তাঁর বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাজনীতিতে আসা বিশেষ করে আওয়ামীবিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়া এবং সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক পার্থ সারথি দাস।

 

কালের কণ্ঠ : কেন রাজনীতিতে এসেছেন?

রেজা কিবরিয়া : আমি দেশের জন্য কাজ করতে চাই। এটা আমি সব সময় ভাবতাম। কিন্তু কোনো কোনো সময় আসে যখন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি রাজনীতিতে আসার। এক দল বাদ দিয়ে আরো এক দলকে সরকারে নিয়ে যাওয়ার পর যদি কাজের ধরনে পরিবর্তন না হয় তাহলে এসব নির্বাচন ও সরকার পরিবর্তন করে কোনো লাভ হবে না। দরকার রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। তবে আমি খুবই খুশি যে এবার নির্বাচন হতে যাচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক। আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে রাজি হয়েছে—এটা বিস্ময়কর ও খুশির। কারণ ভোটারবিহীন নির্বাচন বা প্রতিপক্ষহীন নির্বাচন গণতান্ত্রিক দেশে মানায় না।

 

কালের কণ্ঠ : কখন রাজনীতিতে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন?

রেজা কিবরিয়া : আমি যখন বিবৃতি দিলাম তখনই বলা যায় আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার বাবা আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। আপনি কেন আওয়ামী লীগে না গিয়ে তাঁর বিরোধী জোটে গেলেন?

রেজা কিবরিয়া : বাবার আনুগত্য ছিল দেশের প্রতি। দেশের সেবা তিনি করেছেন। জাতিসংঘে ১১ বছর ছিলেন উপমহাসচিব পদে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি কাজ করেছেন, বিদেশিদের সমর্থন আদায়ের জন্য। তার আগে ১৯৫৪ সালে তিনি জেল খেটেছেন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায়। আমি বলব, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সময় তাঁর ভূমিকা ছিল। দেশের পক্ষে, দেশের মানুষের পক্ষে তিনি কাজ করেছেন। আমার বাবা সরকারি কর্মচারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অধীনে ফরেন মিনিস্ট্রিতে ছিলেন। হয়তো বাবা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের প্রতি অনুগত থাকতে পারেন। কিন্তু তিনি সব কিছুই দেশের ও দেশের মানুষের জন্য করেছেন। বাবার ওপর গ্রেনেড হামলা মামলার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দুই বছর, পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুই বছর এবং তারপর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় সাড়ে ৯ বছরে বিচার হলো না। আমার আওয়ামী লীগের প্রতি কতটুকু আনুগত্য থাকা উচিত? কার আমলে বেশি সময় নষ্ট হয়েছে বিচারহীনতায়?

 

কালের কণ্ঠ : আপনি অভিমান বা ক্ষোভের কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হয়ে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন কি না?

রেজা কিবরিয়া : আমার ৭৩ বছর বয়সী বাবা গ্রেনেড হামলার শিকার হয়ে বিনা চিকিৎসায় ভাঙা অ্যাম্বুল্যান্সে মারা গেছেন। হত্যাকাণ্ডের পর এক যুগ পার হয়ে গেলেও বিচার হয়নি। আংশিক অভিযোগপত্র তুলে দিয়ে বলা হয়েছে তা মেনে নিতে হবে। আমি কোন দলের ওপর বেশি অসন্তুষ্ট থাকতে পারি? ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ আর এখনকার আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেক ব্যবধান। ওই আওয়ামী লীগ আর এই আওয়ামী লীগ এক নয়। নীতি থেকে সরে এসেছে এই আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার আসল আদর্শ ধরে রেখেছেন ড. কামাল হোসেন। আজ আমি তাঁর কাছে গিয়ে ঐক্যফ্রন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছি। এটা এখন পরিষ্কার যে আমি কোন দিকে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি কি আপনার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন?

রেজা কিবরিয়া : আমি আদর্শ থেকে এক চুলও পিছু হটিনি। আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিছি তা বঙ্গবন্ধুও দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণ করার মতো ড. কামাল হোসেন ছাড়া আর কেউ নেই।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার বাবার হত্যাকাণ্ডের আসামি বিএনপি নেতাকর্মীরা। ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন করবে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে। তাহলে ব্যাপারটা কি রকম হলো?

রেজা কিবরিয়া : খুনিরা কোনো দলের হয় না। আমি কোনো দলকে দায়ী করতে চাই না। খুনি-সন্ত্রাসীদের বিচার চাই। বাবার হত্যার বিচার করার দায়িত্ব ছিল সরকারের।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার নির্বাচনী এলাকায় আপনি তো আগে থেকে গণসংযোগে নেই। তাহলে হঠাৎ গিয়ে কিভাবে সব ভোটারের কাছে যাবেন?

রেজা কিবরিয়া : আমি হবিগঞ্জে বহুবার গিয়েছি বাবার নির্বাচনের সময়। বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। নবীগঞ্জ ও বাহুবলে আমাদের আত্মীয়-স্বজনের অভাব নেই। পূর্বপুরুষরা এখানে যুগ যুগ ধরেই বাস করেছেন। তাঁরা তো আমাকে ভুলে যাবে না। বাবার জন্য তাঁদের অনেক টান। তা ভোলার মতো নয়। তাঁদের ভালোবাসার অংশ আমিও পাব।

 

কালের কণ্ঠ : নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে আপনার প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে?

রেজা কিবরিয়া : আমার প্রথম অগ্রাধিকার হবে শিক্ষাখাত। শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের এলাকা পিছিয়ে আছে। পাশের জেলার চেয়ে স্কুল-কলেজ কম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা কুমিল্লার যে চিত্র, নবীগঞ্জ বা বাহুবলে সেই চিত্র নেই। বাহুবলেও স্কুল-কলেজ কম। আমাদের নির্বাচনী এলাকার বহু লোক লন্ডনে থাকে। ধনী এলাকা, কিন্তু শিক্ষার আলো কম। আমি নিজে একসময় শিক্ষক ছিলাম। তাই আমি শিক্ষার আলো ছড়াতে প্রথমেই গুরুত্ব দেব। তারপর স্বাস্থ্যসেবা দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করব। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ও সব স্থানে নিশ্চিত করতে চাই। পাবলিক সার্ভিসের উন্নয়ন করতে হবে। আমি আসলে আঞ্চলিকভাবে ভাবার সঙ্গে ছোট দেশটির পুরো বিষয়ও ভাবতে চাই।

 



মন্তব্য