kalerkantho


আয়কর মেলা শেষ আজ

করাঞ্চলে রিটার্ন জমা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত

৬ দিনে সংগ্রহ ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা

ফারজানা লাবনী   

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



করাঞ্চলে রিটার্ন জমা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত

বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাবে গতকাল আয়কর মেলায় করদাতাদের বিপুল উপস্থিতি। ছবি : কালের কণ্ঠ

সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলার শেষ দিন আজ সোমবার। সকাল ১০টায় শুরু হয়ে মেলা চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের পরও করদাতারা সেবা নিতে চাইলে ফিরিয়ে না দিতে এনবিআর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। গত বছর শেষ দিনে রাত ১০টা পর্যন্ত সেবা দেওয়া হয়। মেলা শেষ হয়ে গেলেও ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কর সার্কেলে গিয়ে রিটার্ন জমার সুযোগ থাকছে। রাজধানীর বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাব প্রাঙ্গণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত আয়কর মেলায় গতকাল রবিবারও ভিড় লেগে ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে সহজে কর প্রদানের সুযোগ দিতে এনবিআরের উচিত আরো বেশি স্থানে আয়কর মেলা আয়োজন করা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লাব চত্বরে বড় বড় তাঁবু টানানো। এসব তাঁবুতে এবং ক্লাব ভবনের মধ্যে সারি সারি বুথে রাজস্ব কর্মকর্তারা সেবা দিচ্ছেন। কর পরিশোধের জন্য এখানে ব্যাংকের বুথ আছে। করদাতারা নির্দিষ্ট বুথে গিয়ে আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণ করে মেলা প্রাঙ্গণে ব্যাংকের অস্থায়ী বুথে গিয়ে আয়কর পরিশোধ করছেন। এরপর রিটার্ন দাখিল করে পরিশোধের সনদ নিচ্ছেন। মেলায় অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের জন্য ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। এই ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে মেলার নির্ধারিত বুথে গিয়ে রিটার্ন পূরণ, কর পরিশোধ ও রিটার্ন দাখিল করা যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে যেকোনো করদাতা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে রিটার্ন দাখিল করতে পারবে।

এবার পুরনো পদ্ধতিতে হাতে লিখে রিটার্ন পূরণ করে ই-পেমেন্টে কর পরিশোধ করা যাচ্ছে।

এনবিআরের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ এ মু’মেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেলা শেষ হয়ে গেলেও ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কর সার্কেলে গিয়ে নিয়মিত রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। বিশেষ কারণে এর পরেও রিটার্ন জমার সুযোগ আছে। শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আয়কর মেলায় সর্বোচ্চ মানের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। করদাতাদের উপস্থিতিও একই ধরনের।’

এবার মেলায় তরুণ ও নারী করদাতার উপস্থিতি লক্ষ করার মতো। ২০১০ সালে শুরু হয় আয়কর মেলা। অতীতের বছরগুলোর তুলনায় এবার ইটিআইএন গ্রহণ, কর পরিশোধ, রিটার্ন দাখিলসহ বিভিন্ন সেবা নিয়েছে বেশি।

এনবিআর সূত্র জানায়, গতকাল ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত মেলায় ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৯ জন সেবা গ্রহণ করে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চার লাখ ৩১ হাজার ৮৪৯ জন বেশি। রিটার্ন দাখিল করে চার লাখ ১২ হাজার ১৯৬, যা গত বছরের তুলনায় এক লাখ ৪৩ হাজার ৪২টি বেশি। গতকাল পর্যন্ত এবার আয়কর সংগ্রহ হয় এক হাজার ৮৯৯ কোটি ৩৯ লাখ ১৬ হাজার তিন টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ১০৮ কোটি ২৬ লাখ ৪২ হাজার ৬৯৩ টাকা বেশি। ইটিআইএন গ্রহণ করে ৩২ হাজার ১০ জন, যা গত বছরের তুলনায় ২৫ হাজার ৮১ জন বেশি।

এবার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উচ্চ আয়ের অনেক করদাতাকে মেলায় উপস্থিত হয়ে কর দিতে দেখা যায়। মন্ত্রী, এমপি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেক নামিদামি ব্যক্তিও নিজে মেলায় এসে রিটার্ন দাখিল করেছেন। অনেক করদাতা এত দিন আইনজীবীর মাধ্যমে রিটার্ন দাখিল করলেও এবার আয়কর মেলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের রিটার্ন নিজেই দাখিল করেন।

তবে মেলায় সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থেকে সেবা গ্রহণ করে। তারা রাজস্বসেবা সাধারণ মানুষের আরো কাছে সহজে পৌঁছে দিতে আরো বেশি স্থানে আয়কর মেলা আয়োজনের দাবি করে।

সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রকৌশল) পাস করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন নুরুন নাহার। আয়কর মেলায় এসে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সহায়তায় এবারে প্রথমবার অনলাইনে রিটার্ন ফরম পূরণ করে ক্রেডিট কার্ডে ই-পেমেন্টে কর পরিশোধ করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা ভালো লাগা বা মন্দ লাগার বিষয় নয়। কর প্রদান প্রত্যেকের দায়িত্ব। এবারে মেলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় রিটার্ন ফরম পূরণ করে ই-পেমেন্টে কর পরিশোধ করেছি। ভবিষ্যতে ঘরে বসেই এসব কাজ সারতে পারব বলে রাজস্ব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।’ তিনি অনলাইনে রিটার্ন জমার জন্য আরো বেশিসংখ্যক বুথ রাখার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘হাতে রিটার্ন জমার চেয়ে অনলাইনে কাজ সারা সহজ, সময় কম লাগে। এ দেশে গ্রামের একটি অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত নারীও মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। এর কারণ তার হাতে এটি সহজে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এভাবে অনলাইনে রিটার্ন জমা ইটিআইএন গ্রহণের পদ্ধতি বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। মেলায় যেহেতু বেশি মানুষ আসছে তাই তাদের অভ্যস্ত করতে এখানে অনলাইনে বুথের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।’

আরেক নারী করদাতা ব্যবসায়ী মনিরা পারভিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর সার্কেলে গিয়ে দেখেছি, রিটার্ন জমা সহজ ছিল না। গতবার মেলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সহজে রিটার্ন জমা দিতে পারি। তাই এবারও এসেছি।’

এনবিআরের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ এ মু’মেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার গড়ে ২৫ শতাংশ নারী ও তরুণ করদাতা বেড়েছে।’

চিকিৎসক নাজিদ জাবেদ বলেন, ‘উত্তরা থেকে আসতে যানজটের কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় লেগেছে। রিটার্ন ফরম পূরণ, কর পরিশোধ এবং রিটার্ন জমা দিতে সময় লেগেছে এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট। ফিরে যেতে একই সময় লাগবে বলে মনে করছি। সব মিলিয়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগছে। উত্তরায় আয়কর মেলার আয়োজন করা হলে আমাদের কাছাকাছি হতো। এতে আরো অল্প সময়ে রিটার্ন জমা দিতে পারতাম।’

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১০ সালে মাত্র দুটি স্থানে আয়কর মেলা আয়োজন করা হয়। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ায় মেলা আয়োজনের স্থান বাড়ানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো বেশি স্থানে মেলা আয়োজন করা হলে করদাতারা সহজে মেলায় এসে রিটার্ন জমা দিতে পারবে।’

এবারের মেলায় করবিষয়ক সব ধরনের সেবার পাশাপাশি অডিও ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে করদাতাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে।

 

 



মন্তব্য