kalerkantho


ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেললাইন

নীতিমালা লঙ্ঘন করে চীনা কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা!

আরিফুর রহমান   

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নীতিমালা লঙ্ঘন করে চীনা কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা!

সরকারের শেষ সময়ে এসে সবাই যখন নির্বাচনমুখী, এই সময়ে নিয়ম-নীতির বাইরে গিয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড (বুলেট) রেললাইন নির্মাণে চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানি থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে গত ৬ নভেম্বর অনেকটা গোপনে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন ইন্টারন্যাশনালের (সিআরসিসিআই) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে ফেলেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কম্পানিটির সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি করতে প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

চীন সরকারের শর্ত অনুযায়ী, তাদের ঋণ নিতে হলে ঠিকাদার তারাই ঠিক করে দেবে। যাকে বলা হয় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম)। যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশটির সরকার ঠিক করে দেয় কোন ঠিকাদার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। বাংলাদেশ বছরের পর বছর চীনের এই শর্ত মেনে নেওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেয়, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বরের পর থেকে চীনের অর্থায়নে বাংলাদেশে যত প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, সব কটি সীমিত দরপত্র (এলটিএম) ডাকতে হবে। অর্থাৎ একটি প্রকল্পের কাজ পেতে চীনা কম্পানিগুলোর মধ্যে সীমিত দরপত্র আহ্বান করা হবে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা যাবে না। সীমিত দরপত্রে অংশ নিয়ে যে কম্পানি সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হবে, সে কম্পানি কাজ পাবে।

২০১৭ সালের ৯ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে জারি করা নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়, চীনা সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির পরিবর্তে সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে। কিন্তু সরকারের সে নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড (বুলেট) রেললাইন নির্মাণে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সিআরসিসিআইর কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পে সীমিত দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে না। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চীনা কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হওয়া মানে এই নয় যে তাদের দিয়ে আমরা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করব। আমরা এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম বুলেট রেললাইন নির্মাণে টাকা দিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রকল্পটি অনেক বড় হওয়ায় এখানে আরো অনেকে ঋণ দিতে চায়। আমরা সবার প্রস্তাব পাওয়ার পর দেখব কার ঋণ সহজ শর্তের। আমাদের দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করব না। দেশের স্বার্থ মাথায় রেখেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’ মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনেক টাকা খরচ হবে। শুধু সরকারি টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। আমাদের বিদেশি ঋণ নিতেই হবে। তবে অবশ্যই সেটা দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে।’

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালা জারি করার আগে চীনের অর্থায়নে প্রকল্পগুলোতে অনেকটা ঢাকঢোল পিটিয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করত দুই পক্ষ। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে অনেকটা গোপনে দুই পক্ষ এমওইউ সই করে। ৬ নভেম্বরের ওই সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন রেলওয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জেনারেল আকতারুজ্জামান হায়দার এবং সিআরসিসিআইর পক্ষে সই করেন কম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াং জিংজুন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেললাইন নির্মাণে আগ্রহ জানিয়ে সিআরসিসিআই যে প্রস্তাব রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে তাতে কম্পানিটি বলছে, হাইস্পিড রেললাইন নির্মাণে তাদের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে এখন যে সাত-আট ঘণ্টা সময় লাগছে, সেটি কমে দুই ঘণ্টায় নেমে আসবে। তাদের প্রাথমিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যত টাকাই খরচ হবে, তাতে ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে রাজি আছে সিআরসিসিআই। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণের জন্য সম্ভ্যাবতা সমীক্ষা এবং বিশদ নকশা তৈরির জন্য কাজ করছে যৌথভাবে চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ডিজাইন ও বাংলাদেশের মজুমদার এন্টারপ্রাইজ। গত ৩১ মে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ কম্পানির চুক্তি সই হয়। যদিও সে সমীক্ষা ও নকশার কাজ এখন চলমান।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আতাউর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নকশা ও সমীক্ষা প্রণয়নের কাজ চলছে। আশা করি, চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন ও মজুমদার এন্টারপ্রাইজ আগামী বছরের মার্চের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন আমাদের কাছে জমা দেবে।’ তখন বোঝা যাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আসলে কত টাকা খরচ হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে চীনের ভূমিকা অপরিসীম। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বিকল্প কোনো অর্থের উৎস না থাকায় বাংলাদেশ বছরের পর বছর সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চীনা কম্পানিকে প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছে। এতে অনেক প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত হয়নি। এর পরই সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার নীতি নেয় বাংলাদেশ।

ইআরডি সূত্র বলছে, পদ্মা পানি শোধনাগার, দাশেরকান্দি পানি শোধনাগার, শাহজালাল সার কারখানার মতো বড় প্রকল্পে একক ঠিকাদার ঠিক করে দেওয়ায় সেখানে অনেক অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য প্রকল্পগুলোতেও অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। চীনের ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে সরকার কঠোর হয় ২০১৬ সালে। ওই বছর চীন সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। শেষ পর্যন্ত ওই বছর অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, চীনের অর্থায়নে প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমিত দরপত্র ডাকতে হবে। দেশটি বাংলাদেশ সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করতে সম্মত হয়। গত বছরের ৯ মার্চ ইআরডি থেকে একটি নীতিমালা জারি করা হয়। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়, সীমিত দরপত্রের এই নীতিমালা ও পদ্ধতি চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে যাওয়া সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে ৩০ নভেম্বর ২০১৬-এর আগে চীনা সরকারি অর্থায়নে যতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণের জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটির অনুমোদন হয়েছে, সেসব প্রকল্প এ নীতিমালার বাইরে থাকবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে রেলপথের দূরত্ব এখন ৩২০ কিলোমিটার। অনেক পথ ঘোরার ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে এখন সময় লাগে ছয় থেকে আট ঘণ্টা। আর প্রস্তাবিত হাইস্পিড (বুলেট) রেললাইনের দৈর্ঘ্য হবে ২৩০ কিলোমিটার। এতে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাবে। আর হাইস্পিড ট্রেন ঘণ্টায় চলবে ২০০ কিলোমিটার গতিতে। এতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে সময় লাগবে এক থেকে দুই ঘণ্টা। হাইস্পিড রেললাইনের নির্মাণকাজ শেষ হলে যাতায়াতে সময় কমে আসবে চার ঘণ্টা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের বর্তমান রুটে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। নতুন রুট অনুযায়ী, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, দাউদকান্দি হয়ে কুমিল্লা-লাকসাম দিয়ে ফেনী, চিনকি আস্তানা, সীতাকুণ্ডু হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত সহজ হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ অর্থনীতির নানা উন্নয়ন সাধিত হবে।

 



মন্তব্য