kalerkantho


আইনজীবী মহাসমাবেশে ড. কামাল হোসেন

বয়কট করব না, নির্বাচনে থাকব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বয়কট করব না, নির্বাচনে থাকব

সুপ্রিম কোর্ট বার চত্বরে গতকাল ‘আইনজীবী মহাসমাবেশ’ আয়োজন করে জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট। ছবি : কালের কণ্ঠ

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষস্থানীয় নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একবার নির্বাচন বর্জন করে ভুগতে হয়েছে। তাই কোনো অবস্থায়ই এবার আর নির্বাচন বর্জন করবেন না তাঁরা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে। নির্বাচন ঘিরে সব ভোটারকে দলে দলে ভোট দেওয়ার এবং ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গতকাল শনিবার জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত এক আইনজীবী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন ওই আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আপনারা তৈরি হোন। আমরা হাজারে হাজারে গিয়ে ভোট দেব। দেশের সকল ভোটারকে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। আমরা অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।’ বিশিষ্ট এই আইনজীবী বলেন, ‘যত রকমের দশ নম্বরি হোক না কেন, সবাইকে বলব, আমরা বয়কট করব না, নির্বাচনে থাকব।’ তিনি আরো বলেন, ‘এবার নির্বাচনে দুই কোটি তরুণ ভোটার। এরাই দেশের মালিক। নির্বাচনকে ঘিরে গুণ্ডাপাণ্ডা থাকবে, তবু আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ঘরে ঘরে মানুষকে গিয়ে বোঝাতে হবে।’

জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ দেশের বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের আইনজীবী নেতারা। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাজা বাতিল করে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিসহ সমাবেশে উপস্থিত বক্তাদের আলোচনা থেকে গৃহীত ১১টি সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।

খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এটা খুবই ন্যায়সংগত দাবি। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। দেশে এখন একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সব মহল থেকে দাবি। প্রধানমন্ত্রীও বলছেন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের এই সময় একটা দলের নেত্রী সরকারের প্রধান থাকবেন আর আরেক দলের নেত্রীকে কেন্দ্রীয় কারাগারে রেখে অপমান করা হবে—এটা একদমই মেনে নেওয়া যায় না। এ কারণেই খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রয়োজন, যাতে উনি দেশের মানুষের কাছে গিয়ে নির্বাচনে ভোট চাইতে পারেন।’ ড. কামাল বলেন, ‘শুধু তো খালেদা জিয়া একা কারাগারে নেই। হাজার হাজার লোককে জেলে রাখা হয়েছে। আমি প্রতিদিনই শুনছি গ্রেপ্তারের কথা।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে গ্রেপ্তার করা হবে, আরেক দিকে একটি দল নির্বাচনী প্রচারণা চালাবে, এভাবে বৈষম্য সৃষ্টি করে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না, সাংবিধানিক শাসনও থাকবে না। দেশ একটা অরাজকতার মধ্যে পড়ব।’

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারসংক্রান্ত উদ্যোগের সমালোচনা করে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘সকলের মতামত উপেক্ষা করে কোটি কোটি টাকা ব্যবহার করে কেন ইভিএম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এই দেশটা ১৬ কোটি মানুষের। কিন্তু এঁরা পাঁচজন মিলে যা মনে করেন তা-ই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। জাতীয় নীতির তোয়াক্কা না করে তাঁরা এসব করছে।’

ড. কামাল বলেন, ‘এ সরকারের আমলে বিচার বিভাগের ওপর আঘাত এসেছে, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে, নিম্ন আদালতের দায়িত্ব পালন অসম্ভব করে দেওয়া হচ্ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেওয়া নিয়ে শাস্তি পেতে হয়েছে। সাতজন বিচারপতি মিলে একটা রায় দিলেন। কিন্তু একজনকে শাস্তি পেতে হলো।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০১৪-এ একটা নির্বাচন হয়েছিল। পরে যখন কোর্টে আসলো, অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আমাকে ডেকেছিল। আমি কোর্টে বলেছিলাম, এটা কোনো নির্বাচনই ছিল না। আরেকটা নির্বাচন করতে হবে। সরকারের পক্ষের লোকই সেখানে বলেছে, একটি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য করেছে, দ্রুত আরেকটা নির্বাচন দিবে। দ্রুত মানে কি পাঁচ বছর?’

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি খুব জোর গলায় বলতে পারি, সম্পূর্ণ সরকারি চাপের মুখে খালেদা জিয়াকে বেআইনিভাবে সাজা দেওয়া হয়েছে। আমি আজ দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, এ ব্যবস্থার পরিবর্তন হতে হবে। বিচার বিচারের মতো হতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় যেন কোনো ব্যক্তির বিচার না করা হয় সে জন্য আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগের দিকে তাকিয়ে থাকি। যখন সরকার দ্বারা আক্রান্ত হই তখন এই মহান ভবনে আসি একটু আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু বিচার বিভাগে সেই আশ্রয়টুকুও আমাদের আজ নেই।’ ফখরুল বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা এই বন্ধ্যত্বের যুগে, যখন কেউ কোনো প্রতিবাদ করে না, সত্য বলে না, তখন এই মানুষটি দাঁড়িয়েছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি সত্য রায় দিয়েছিলেন, সত্য বলেছিলেন। এ জন্য সরকার তাঁকে জোরজবরদস্তি করে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম আপনারা আজ তাঁকে স্মরণ করবেন। কিন্তু কেউ সেটি করলেন না। আমাদের সবার উচিত তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা জানানো এবং তিনি যে কথাগুলো উচ্চারণ করে গেছেন সেগুলো বারবার বলা উচিত।’

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘আমরা এমন একটি রাষ্ট্রে বাস করছি যেখানে আইনজীবীরাও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছে।’ তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে কেন্দ্র থেকে ফলাফল ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না।



মন্তব্য