kalerkantho


রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমারের নিন্দায় জাতিসংঘে প্রস্তাব গৃহীত

চীন-রাশিয়ার বিরোধিতা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমারের নিন্দায় জাতিসংঘে প্রস্তাব গৃহীত

ফাইল ছবি

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব গতকাল শুক্রবার রাতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে গৃহীত হয়েছে ১৪২-১০ ভোটে। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হলো চীন, রাশিয়া, জাপান, বেলারুশ, বুরুন্ডি, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপিন্স ও মিয়ানমার। ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ মোট ২৬টি দেশ পক্ষে ও বিপক্ষে কোনো অবস্থান না নিয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। গত বছর তৃতীয় কমিটিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি প্রস্তাব ১৩৫-১০ ভোটে গৃহীত হয়েছিল। তখনো ২৬টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল।

এবারে প্রস্তাবটি এনেছিল ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ওআইসি সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ ওই প্রস্তাব জাতিসংঘে উপস্থাপন করে। প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রসঙ্গে ভারতীয় এক কূটনীতিক গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা সাধারণত সুনির্দিষ্ট কোনো দেশ নিয়ে প্রস্তাবকে সমর্থন দেন না। এ ছাড়া ওআইসির প্রস্তাবেও ভারত সাধারণত পক্ষে ভোট দেয় না। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—দুই দেশেরই সীমান্ত লাগোয়া হিসেবে ভারত পক্ষে বা বিপক্ষে কাউকেই ভোট দেয়নি।

এদিকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গত রাতে ভোটের আগে মিয়ানমার ওই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে সবাইকে তা প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমারের জনগণ ও তাদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার আহ্বান জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি তাঁর বক্তব্যে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ‘পয়েন্ট অব অর্ডারের’ সুযোগ নিয়ে তাঁর দেশের জনগণের সিদ্ধান্তকে (রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার না করা) সম্মান করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নে কাজ করছে। কফি আনান কমিশনের ৮৮টি সুপারিশের মধ্যে ৮১টি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রমাণ ছাড়া আবেগী অভিযোগ তুলে জাতিসংঘে প্রস্তাব আনা অনাকাঙ্ক্ষিত।

মিয়ানমারের অভিযোগ, বাংলাদেশ কক্সবাজারে আশ্রিতদের সঠিক ফরম দিচ্ছে না বলেই যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাবাসনে দেরি হচ্ছে। যারা ফিরতে চায় মিয়ানমারের দরজা তাদের জন্য খোলা।

গত বছর রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংকটের জন্য কথিত রোহিঙ্গা গোষ্ঠী আরসাকে দায়ী করে মিয়ানমারের প্রতিনিধি বলেন, ওই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আল-কায়েদা, আইএস, তেহরিক-ই-তালেবানের যোগাযোগ আছে।

অন্যদিকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন ভোটের আগে বলেন, গত বছর বিশ্ব আবারও রোহিঙ্গাদের নৃশংসতম সহিংসতা থেকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাদের একজনও ফিরতে রাজি না হওয়া প্রমাণ করে যে মিয়ানমারের উদ্যোগে তারা আশ্বস্ত হয়নি। উপরন্তু তারা নাগরিকত্ব, চলাফেরার স্বাধীনতা, ভূমির অধিকার ও নিরাপত্তা দাবি করেছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না আবার জোর করে কাউকে রাখাও হবে না।

চীন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেছে, পরিস্থিতি জটিল না করে সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা করা উচিত।

রাশিয়া বলেছে, এই প্রস্তাবে সংকট সমাধান হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাবকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেছে, মিয়ানমারের চুক্তি সই ও আশ্বাস যথেষ্ট নয়। তাদের কাজ দেখাতে হবে। সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রস্তাবে যা আছে : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে গত রাতে গৃহীত ‘মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি’ প্রস্তাবে মিয়ানমারে বিশেষ করে রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে অব্যাহতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের স্বাধীনতার আগে থেকে রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে নাগরিকত্বহীন করা এবং ২০১৫ সালে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

২০ দফা প্রস্তাবের শুরুতেই জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে গণহত্যা, হত্যা, আটক, গুম, ধর্ষণ, যৌন দাসত্বসহ অন্যান্য যৌন নির্যাতন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে উদ্বেগ জানানো হয়। প্রস্তাবে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে ওই দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান রয়েছে।

প্রস্তাবের পঞ্চম দফায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ গঠিত স্বাধীন কাঠামোর কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবের অষ্টম দফায় মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বন্ধ করতে জরুরি তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদের রাষ্ট্রহীনতা দূর করা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানানো হয়েছে।

 



মন্তব্য