kalerkantho


৮ বছর পর টেস্টে সেঞ্চুরি

মাহমুদ উল্লাহর ভাগ্যবদলে তৈরি জয়ের পথও

মাসুদ পারভেজ   

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মাহমুদ উল্লাহর ভাগ্যবদলে তৈরি জয়ের পথও

দীর্ঘ আট বছরের প্রতীক্ষার অবসান। আবারও টেস্টে শতরান পেলেন মাহমুদ উল্লাহ। উচ্ছ্বাসটা তাঁর অমন বাঁধনহারা হবেই। মাহমুদের অপরাজিত ১০১ রানে ভর করে জিম্বাবুয়ের সামনে ৪৪৩ রানের কঠিন লক্ষ্য দিয়েছে বাংলাদেশ। ছবি : মীর ফরিদ

গত ৮ বছর ৯ মাসে তাঁর চোখের সামনেই বদলে যেতে দেখেছেন কত কিছু! কত বদলেছে তাঁর ব্যক্তিজীবনও! নিজ ভাগ্যের অদলবদলও দেখেছেন কত!

এর মাঝেই বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। হয়েছেন সন্তানের বাবাও। ক্রিকেট মাঠের দুনিয়ায়ও কম বদল দেখেননি। এই সময়ের মধ্যেই টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে মমিনুল হকের উত্থান দেখেছেন। হৈচৈ ফেলে  দেওয়া আগমনেই মুস্তাফিজুর রহমানকে দেখেছেন খ্যাতির চূড়ায় চড়ে বসতে। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়ে সক্রিয় অংশীদার ছিলেন। আবার বাংলাদেশের শততম টেস্ট জয় কিংবা নিজেদের ডেরায় অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর সময় ছিলেন স্রেফ দর্শক। টেস্ট দলে জায়গা হারানো এই ব্যাটসম্যানই আবার দেশের প্রথম বিশ্বকাপ সেঞ্চুরিয়ান। বাংলাদেশকে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কিংবা ২০১৭-র চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে তোলার অন্যতম নায়ক টেস্ট দলে জায়গা পুনরুদ্ধার করে নিয়মিত অধিনায়কের চোটে দিয়েছেন নেতৃত্বও। এবং দিচ্ছেনও।

এই সময়ের মধ্যে ৪৫ টেস্ট খেলা বাংলাদেশের কত ব্যাটসম্যান কীর্তির কত মালাও গেঁথেছেন! শুধু মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটেই শুধু কীর্তি দূরের কথা, দেখা মিলছিল না আরেকটি টেস্ট সেঞ্চুরির। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিই এত দিন ধরে হয়ে থেকেছে তাঁর শেষ। অবশেষে দীর্ঘ সেই অপেক্ষার অবসান এমন সময়ে, যখন রানে না থাকা অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর টেস্ট দলে জায়গা নিয়েই আবার নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে দিয়েছিল।

তাঁর দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরির ‘টাইমিং’ও তাই হলো একেবারে মোক্ষম সময়েই। ব্যাট-বলের ঠিকঠাক হওয়া টাইমিংয়ে তিনি তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছে যেতেই আর বিলম্ব নয়। জিম্বাবুয়েকে ফলোঅন না করিয়ে নিজেরাই মিরপুর টেস্টের চতুর্থ দিন সকালে আবার ব্যাটিংয়ে নেমে যাওয়া বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ২২৪ রান তুলে ঘোষণা করে দ্বিতীয় ইনিংস। তাতে চা বিরতির পর রান তাড়ায় নামা সফরকারীদের সামনে দাঁড়ায় ৪৪৩ রানের দুঃসাধ্য এক টার্গেটই। চতুর্থ দিনের শেষ বেলায় জিম্বাবুয়ের দুই ওপেনারকে তুলে নিয়ে জিতে সিরিজ বাঁচানোর কাজ কিছুটা এগিয়েও দিয়েছেন দুই স্পিনার তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ।

২ উইকেটে ৭৬ রান নিয়ে চতুর্থ দিন পার করা জিম্বাবুয়েকে আজ শেষ দিনে জিততে করতে হবে আরো ৩৬৭ রান। টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডই যেখানে ৪১৮ রানের, সেখানে এই জিম্বাবুয়ের পক্ষে শেষ দিনে ৯০ ওভার পার করে দিয়ে ড্র করার সম্ভাবনাও আপাতত কল্পলোকের গল্পই। তুলনায় বাকি ৮ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের জেতার সম্ভাবনার পাল্লাই ভারী। আসলে নিতে হবে ৭ উইকেট। কারণ চোটে এই টেস্ট থেকে ছিটকে পড়া টেন্ডাই চাতারা তো ব্যাটিংয়েই নামতে পারবেন না।

উইকেট যখন ভাঙছে, তখন চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিংয়ের দুরূহ কাজটি জিম্বাবুয়েকে দিয়ে করাবে বলেই ফলোঅন না করিয়ে নিজেরা ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। তাতে দিনের প্রথম ঘণ্টায় ১২ ওভারে ২৫ রান যোগ করতেই মমিনুলসহ (১) তিন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে হারায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ঘণ্টার প্রথম বলে হারায় আগের ইনিংসের ডাবল সেঞ্চুরিয়ান মুশফিকুর রহিমকেও (৭)। এই ঘণ্টায় ১৩ ওভারে ওঠে ৫৩ রান। ২৫ রানে ৪ উইকেট হারানোর বিপর্যয় অবশ্য মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে যাওয়ার সময় সামলে নিয়েছিল মোহাম্মদ মিঠুন-মাহমুদ উল্লাহ জুটি।

রান বাড়ানোর তাড়ায় মিঠুন উইকেট দেওয়ার সময় এই জুটি স্কোরবোর্ডে জমা করে দিয়েছে ১১৮ রান। তার আগে টেস্ট অভিষেকে প্রথম ইনিংসে ডাক মারা মিঠুন পেয়ে গেছেন প্রথম ফিফটির দেখাও। এরপর আরিফুল হকও (৫) দ্রুত বিদায় নিলে মাহমুদ উল্লাহর সঙ্গে জুটি জমে যায় মিরাজের (২৭*), যাঁর সঙ্গে প্রথম ইনিংসে জমেছিল মুশফিকেরও। সবশেষ ১০ টেস্ট ইনিংসে একটিও ফিফটি না করা মাহমুদও (১০১*) ছুটতে থাকেন নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরির পথে। ১২২ বলে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যখন যান, তখন চা বিরতিও সমাগত।

ইনিংস ঘোষণা করে দিয়ে তাই জিম্বাবুয়েকে আরেকবার অল আউট করার জন্য চার সেশন রাখে স্বাগতিকরা। খালেদ আহমেদ ও তাইজুল ইসলামের বলে জিম্বাবুয়ের দুই ওপেনারকে একবার করে মিরাজ জীবন দেওয়ার পরও শেষ বিকেলে দুজনকেই বিদায় করেছে বাংলাদেশ। তাতে জিতে সিরিজ বাঁচানোর পথেও কাজ অনেকটা এগিয়ে রেখেছে মাহমুদ উল্লাহর দল।

গত ৮ বছর ৯ মাসে নিজ ভাগ্যের কত অদল-বদল দেখার পর যাঁর সেঞ্চুরি ভাগ্যও বদলাল এমন এক টেস্টে, যে টেস্টের আগে দলের মতো তিনিও দাঁড়িয়ে ছিলেন খাদের কিনারায়!

 

 



মন্তব্য