kalerkantho


বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে নয়াপল্টন রণক্ষেত্র

পুলিশের গাড়িতে আগুন ভাঙচুর, আহত ৪০

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে নয়াপল্টন রণক্ষেত্র

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ কার্যক্রম চলার মধ্যে রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এরপর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ধাওয়াধাওয়ি, গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস শেল ও প্যালেট বুলেট (ছররা গুলি) ছোড়ে। বিএনপিকর্মীরা পুলিশের দুটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ভাঙচুর করে তিন-চারটি ব্যক্তিগত গাড়ি।

সংঘর্ষে বিএনপির ১৫-২০ জন কর্মী আহত হয়। অন্যদিকে বিএনপিকর্মীদের হামলায় পুলিশের অন্তত ২৩ সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।

ঘটনার পর সন্ধ্যায় পল্টন এলাকা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলাল উজ্জামান তালুকদার লালুকে আটক করা হলেও পরে তাঁকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। বিএনপির নেতারা দাবি করেছেন, তাঁদের অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।

গতকাল রাত ১২টার দিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই সংঘর্ষের ঘটনায় পল্টন থানায় তিনটি মামলা দায়েরের বিষয় প্রক্রিয়াধীন ছিল। এসব মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ কয়েক শ নেতাকর্মীকে আসামি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পল্টন থানা সূত্র।

সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করে। ধানমণ্ডিতে দলের সভাপতির কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শেষ হয় গত সোমবার।

বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিক্রি এখনো চলছে।

সব দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের জন্য তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল করে দলীয় কার্যালয়ে আসছে। দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় মিছিল, শোডাউন নির্বাচনী আচরণবিধির পরিপন্থী স্বীকার করে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়।

ইসির এই নির্দেশের পরের দিন নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল। পুলিশ বলছে, রাস্তা থেকে বিএনপিকর্মীদের সরাতে গেলে তারা পুলিশের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা করে।

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিনা কারণে পুলিশ বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে।

গতকাল সন্ধ্যায় আহতদের দেখতে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এর আগে বিকেলে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তবে তখন পর্যন্ত কাউকে আটকের খবর পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের সঙ্গে তাঁদের কর্মী-সমর্থকরা ভিড় করে। পুলিশ তাদের রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছিল না। দুপুর পৌনে ১টার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বড় একটি মিছিল নিয়ে ঢাকা-৮ আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম কিনতে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আসেন। এ সময় পুরো রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুই পাশেই তীব্র যানজট দেখা দেয়। পুলিশ বিএনপিকর্মীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে পুলিশের একটি গাড়ি মিছিলের ভেতর ঢুকে পড়লে বিএনপির কয়েকজন কর্মীর গায়ে লাগে। বিএনপির কর্মীরা দাবি করে, পুলিশ মিছিলের ওপর গাড়ি তুলে দিয়েছে। এতে তাদের কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছে। এ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে বাগিবতণ্ডায় জড়ায় বিএনপির কর্মীরা। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে বিএনপির কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন বিএনপির কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। ব্যাপকসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মীর উপস্থিতির কারণে পুলিশ বাধ্য হয়ে কাকরাইল মোড়ের দিকে চলে যায়। এ সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। ভাঙচুর করে তিন-চারটি ব্যক্তিগত গাড়ি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, কিছুক্ষণ পর পুলিশে দাঙ্গা দমন বিভাগের শতাধিক সদস্য ঘটনাস্থলে আসে। পরে দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও প্যালেট বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলায়।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ কাকরাইল মোড়ে অবস্থান নেয়। এ সময় বিএনপির কর্মীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে কাকরাইলসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যানবাহন নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়। পুলিশ নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে মতিঝিলের দিকে যাওয়ার রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেয়। বিএনপির কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে কাকরাইলের দিকে আসে, পরে আবার ফিরে যায়। দুপুর পৌনে ২টার দিকে কাকরাইল মোড়ের পাশে কর্মীরা রাস্তায় বসে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়ে স্লোগান দেয়। কাউকে কাউকে রাস্তায় শুয়ে পড়তেও দেখা যায়। এ সময় কাকরাইল মোড়ে কয়েক শ পুলিশ অবস্থান নেয়। সেখানে রাখা হয় সাঁজোয়া যানসহ মিছিল ছত্রভঙ্গ করার সরঞ্জাম। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কিছু কিছু গাড়ি চলতে শুরু করে। সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।

বিএনপির আহত নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন খিলগাঁওয়ের মোস্তাক হোসেন, পিরোজপুরের নেছারাবাদের শামসুল হক, রাজধানীর মুগদার মেহেদি হাসান মিরাজ, অরিন, পল্টনের মো. কাদির, হৃদয় শেখ, মতিঝিলের মকবুল হোসেন, সবুজবাগের মনির হোসেন, কলাবাগানের সুমন, বিমানবন্দর থানা এলাকার মহিউদ্দিন রতন, মাদারীপুরের সাখাওয়াত হোসেন এবং পিরোজপুরের আসাদুজ্জামান। তাঁদের গলা, মাথা ও পিঠে গুলির আঘাত লেগেছে বলে জানা গেছে।

পুলিশের ভাষ্য : ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন পুলিশ সদস্য জানান, দুপুর পৌনে ১টার দিকে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস ও আখতারুজ্জামানের কর্মী-সমর্থকরা মিছিল নিয়ে বিএনপি কার্যালয়ের দিকে আসার সময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে নেতাকর্মীরা পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। তারা রাস্তায় চলাচল করা অন্যান্য ব্যক্তিগত গাড়িও ভাঙচুর করে।

দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপির কর্মীরা রাস্তা আটকে দিয়েছিল। এ সময় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য পুলিশ অনুরোধ করে। কিন্তু তারা অনুরোধ শোনেনি। তারা এ কথা না শুনে হঠাৎ করে বিনা উসকানিতে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরে তারা আমাদের দুটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়।’

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “বিএনপির কর্মীরা নির্বাচন সামনে রেখে ‘ইস্যু তৈরির লক্ষ্যে’ বিনা উসকানিতে নয়াপল্টনে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা তা মানেনি।” আহত পুলিশ সদস্যদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

বিএনপির নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের অনুরোধ জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ রাষ্ট্রের কর্মচারী। পুলিশকে প্রতিপক্ষ ভাববেন না।’

বিএনপি-আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘চক্রান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। বিএনপির বিরুদ্ধে পাল্টা একই অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, “পুলিশের ওপর হামলার মাধ্যমে বিএনপি আগের ‘সন্ত্রাসী’ চেহারায় ফিরেছে।”

বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্বেগ : সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। জোটের সমন্বয়ক মো. শাহ আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় শোডাউনকে নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল বাম জোট। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ব্যাপক শোডাউন করে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও নির্বাচন কমিশন সেটাকে নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করেনি। এরপর অন্যান্য দল একইভাবে শোডাউন করে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলে তাকে আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে নির্বাচন কমিশন পরিপত্র জারি করে। এই পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আবারও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জাসদের নিন্দা : সংঘর্ষের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার। এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, বিনা উসকানিতে বিএনপির লোকজন পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছে, পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে। ভাঙচুর করেছে সাধারণ মানুষের গাড়ি। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এই ঘটনাকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন তাঁরা। নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

 



মন্তব্য