kalerkantho


বিদেশি কূটনীতিকদের বিএনপি

গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নির্বাচন সুষ্ঠু করুন

যত বেশি সম্ভব পর্যবেক্ষক পাঠান

মেহেদী হাসান   

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নির্বাচন সুষ্ঠু করুন

দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বিদেশিদের ভূমিকা চেয়েছে বিএনপি। দলটি একই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে ওই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সহযোগিতা চেয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে এ সহযোগিতা চাওয়া হয়। বৈঠকের শুরুতে বিএনপির পক্ষে বক্তব্য দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে বাঁচানোর আহ্বান জানান এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বিদেশিদের ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে তিনি যত বেশি সম্ভব পর্যবেক্ষক পাঠাতে বিদেশি কূটনীতিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাত বছর ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশকে বিতর্কিত ও ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে বৈঠকে বিএনপি নেতারা বলেন, এই সাজা সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা নেই। তাঁরা এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু মামলার উদাহরণ দেন। বিএনপি নেতারা বলেন, সাজার পরও সিরাজুল হক চৌধুরী নির্বাচনে অযোগ্য হননি। একইভাবে এইচ এম এরশাদ, ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর নির্বাচন করতে পেরেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আপিলে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার তিন বছরের সাজা বহাল থাকার পরও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এখনো তিনি মন্ত্রী আছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবদুর রহমান বদি আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৬ সালে বিশেষ আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এরপর তিনি জামিনে বের হয়ে সংসদ সদস্য পদে বহাল আছেন।

বিদেশি কূটনীতিকদের দেওয়া একটি অবস্থানপত্রে বিএনপি বলেছে, ‘বিচারিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত বা সাজা হলে অ্যাপিলেট ডিভিশনে ওই রায় চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য হন না। এ কারণে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য।’

ড. আব্দুল মঈন খান বিদেশি কূটনীতিকদের উদ্দেশে বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার বিষয়ে বিএনপি অবগত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংলাপের উদ্যোগ নিয়ে আশার আলোর সঞ্চার করলেও তা দ্রুতই নিভে গেছে। তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ফেরাতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। বিএনপিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল উল্লেখ করে তিনি বলেন, খ্যাতিমান রাজনীতিক আ স ম আবদুর রব, কাদের সিদ্দিকী. ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুরসহ আরো যাঁরা গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁরা এ দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শেষ চেষ্টা হিসেবে একতাবদ্ধ হয়েছেন। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন।

কোনো দাবি মানেনি সরকার : কূটনীতিকদের কাছে বিএনপি অভিযোগ করেছে, সরকার তাদের ১১টি লক্ষ্য ও সাতটি সুনির্দিষ্ট দাবির একটিও মানেনি। খালেদা জিয়াকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে পাঠানো এবং নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিচার করাকে সরকারের নিষ্ঠুরতা হিসেবে অভিহিত করেছে বিএনপি। এ ছাড়া সরকার বিএনপির নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করছে বলেও তারা অভিযোগ করেছে।

সংশোধিত আরপিওর গেজেট হয়নি : জানা গেছে, বৈঠকে বিএনপি নেতারা কূটনীতিকদের জানান, সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) এখনো গেজেট প্রকাশ করা হচ্ছে না। সম্প্রতি আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে ডাকাত, লুটেরা ও অন্য অপশক্তিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপি দাবি করেছে।

বিএনপি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ও সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। বিএনপি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ পদোন্নতি : সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে নির্বাচনের প্রাক্কালে উদ্দেশ্যমূলক পদোন্নতি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিএনপি। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ‘ব্রোকেন ড্রিম’ বইকে বিচার বিভাগের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চেষ্টার বড় নজির হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

সরকার নিজেই নির্বাচন পেছাতে চেয়েছিল : বিদেশি কূটনীতিকরা নির্বাচন পেছানো নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপি নেতারা বলেছেন, তাঁরা এক মাস পেছানোর দাবি করেছিলেন। কিন্তু সরকার নির্বাচন মাত্র এক সপ্তাহ পিছিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও নির্বাচন এক সপ্তাহ পেছানোর দাবি ছিল বলে তাঁরা জানান।

নির্বাচন আরো পেছাতে পারে কি না, এমন প্রশ্ন উঠলে বিএনপি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব দেয়নি।

জামায়াত নিয়ে প্রশ্ন : জামায়াতে ইসলামী বিএনপির প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে কি না এমন প্রশ্ন উঠেছিল পশ্চিমা একটি দেশের পক্ষ থেকে। বিএনপি নেতারা বলেছেন, জামায়াত এখনো (বৈঠক চলাকালীন সময় পর্যন্ত) এ বিষয়ে বিএনপিকে জানায়নি।

বিএনপির পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, শামা ওবায়েদ, ব্যারিস্টার মীর হেলাল, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, অ্যাডভোকেট ফাহিমা মুন্নী, জেবা খান প্রমুখ।

ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সুইডেন, পাকিস্তান, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, স্পেন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার কূটনীতিক বা কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।



মন্তব্য