kalerkantho


উভয়সংকটে ঐক্যফ্রন্ট

► আন্দোলন ও নির্বাচন দুই প্রশ্নেই চাপে বিএনপি
► নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষেই মত, সিদ্ধান্ত শনি বা রবিবার

এনাম আবেদীন   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



উভয়সংকটে ঐক্যফ্রন্ট

সংলাপ বা আলোচনা থেকে আর কোনো ফল বেরিয়ে আসার প্রত্যাশা ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কারণ গত এক সপ্তাহের ভূমিকায় সরকার বেশ হার্ডলাইনে বলেই ধরে নিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ দুই প্রশ্নেই বেশ সংকটের মধ্যে পড়েছে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামসহ জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য মূলত বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। আন্দোলন ও নির্বাচন দুই প্রশ্নেই মূল ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত বিএনপির ওপরই নির্ভর করছে। কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের কারণে বিএনপি বর্তমানে চাপের মুখে রয়েছে। সংলাপ নিয়ে দলটি গত এক সপ্তাহ ব্যস্ত থাকলেও তা থেকে দৃশ্যমান কোনো অর্জন নেই। উপরন্তু এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ভোট হবে আগামী ২৩ ডিসেম্বর। আর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় আগামী ১৯ নভেম্বর। এর জন্য ঐক্যফ্রন্টের হাতে আছে আর মাত্র ১০ দিন। এই সময়ের মধ্যে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে আসনবণ্টন এবং প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা শুধু কঠিনই নয়, অত্যন্ত চ্যালেঞ্জেরও। অন্যদিকে এই সময়ের মধ্যে আন্দোলন করে সরকারকে চাপে ফেলা আরো কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ঐক্যফ্রন্টকে হয় আন্দোলন অথবা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে না যাওয়ার কথা এখনো বলিনি। কিন্তু সরকার ক্রমেই চলার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। সংলাপে স্পষ্ট আশ্বাসের পরেও শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত ফ্রন্টের বৈঠকে হবে।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার কোনো দাবি না মানলে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে আমরা যেতে চাই। কিন্তু সংলাপের পরেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার, ধরপাকড় অব্যাহত রেখেছে। এতে মনে হচ্ছে, সরকারই চায় না আমরা নির্বাচনে যাই।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনে গিয়েই ঐক্যফ্রন্ট পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে চায়। কিন্তু সরকার চায় কি না যে আমরা নির্বাচনে যাই, সেটাই সন্দেহ।’ তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তিনি মনে করেন, তফসিল যেভাবে ঘোষণা করা হয়েছে তাতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কঠিন। কেননা এই সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে না। তিনি বলেন, ‘আন্দোলন নিয়ে সমস্যা নেই, আন্দোলন হবে। কিন্তু এ বিষয়ে আলোচনার আগে কিছু বলা যাবে না।’

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন মনে করেন, নির্বাচন নিয়ে সংকট আগে থাকলেও ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান ছিল আন্দোলন ও নির্বাচন দুটিতেই থাকা। কিন্তু দ্রুত তফসিল ঘোষণা করায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সংকট আরো বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘মনোনয়নপত্র দাখিলের যে সময় দেওয়া হয়েছে সেটি একটা অসম্ভব ব্যাপার।’ আন্দোলন নিয়ে সংকট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংকট কী? আন্দোলন কেমন হবে সেটি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপির পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টও মনে করে, নির্বাচন বাদ দিয়ে আন্দোলন করতে গেলে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে হবে। কিন্তু দল ও জোটকে সুসংগঠিত করে আন্দোলনে নেমে সফলতা পাওয়া না গেলে আবারও লোকবল ক্ষয়ের পাশাপাশি হাজার হাজার মামলার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান সরকার ও নির্বাচনী কাঠামোর মধ্যে নির্বাচনে গিয়েও ফল কী পাওয়া যাবে তা নিয়ে বিএনপির পাশাপাশি ফ্রন্টের সব দলের মধ্যে প্রশ্ন আছে। আছে মতভিন্নতাও। বিশেষ করে বিএনপির মধ্যে এ প্রশ্নে ভিন্নমত সবচেয়ে বেশি। গত বুধবার বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা ও সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় নির্বাচন প্রশ্নে দুই ধরনের মত উঠে আসে। একাংশ মত দেয় যে, বর্তমান কাঠামোর মধ্যে নির্বাচনে গিয়ে লাভ নেই। কিন্তু নির্বাচনে না গিয়ে বিকল্প কী করার আছে সে বিষয়ে আবার কারো স্পষ্ট মত পাওয়া যায়নি। আরেক অংশ মত দেয়, পরিস্থিতি যাই হোক, নির্বাচনকেই মোকাবেলা করতে হবে।

লোকবল ক্ষয় ও মামলার ঝুঁকি এড়াতে রাজশাহীমুখী গতকালের পদযাত্রা কর্মসূচি বাতিল করেছে ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনের আগে ঢাকার বাইরে আন্দোলন করে লোকবল ক্ষয় এবং মামলার ঝুঁকি আর বাড়াতে রাজি নয় তারা। ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মতে, আন্দোলন কর্মসূচি পালন করতে হলে তা ঢাকায় করাই ভালো। সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে কর্মসূচি ঢাকায়ই দেওয়া হবে।

গতকাল ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপিকে আলোচনাসভাও করতে দেয়নি পুলিশ। উপরন্তু সমবেত হওয়া নেতাকর্মীদের কয়েকজনকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে পুলিশ। রাজশাহীতে আজ বিএনপির পূর্বনির্ধারিত জনসভা থাকার মুখে আশপাশের কয়েকটি জেলায় পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হবে না—প্রধানমন্ত্রীর এমন আশ্বাসের পরও মঙ্গলবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকে ১১০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে এমন অভিযোগ করেছেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্দোলন এবং নির্বাচন কোনো প্রশ্নেই এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে বিএনপির দলীয় ফোরামের পাশাপাশি ২০ দল এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, ‘সংলাপ থেকে কিছু পাওয়া যাবে—সরকারের আচরণে সে রকম মনে হচ্ছে না। নির্বাচন কিভাবে করব? কারণ সরকারই চায় না আমরা নির্বাচন করি। এসব না করে আমাদের ব্যান্ড করে দিলেই তো পারে। বললেই হয় যে আর কোনো বিরোধী দল দেশে থাকবে না।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করায় নির্বাচন ও আন্দোলন প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কিছুটা সংকটে পড়েছে। তাদের আন্দোলন ও নির্বাচন দুটিতে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের চাকরের মনোবৃত্তির কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। কমিশন চাচ্ছেই না যে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন করুক।’

বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়ার প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অভিমতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে অনেক চেষ্টা করেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারছিলেন না মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিষয়টি নিয়ে বুধবার দ্বিতীয় দফা সংলাপে কথা তুলেছেন ফখরুল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর আলাপ হওয়ার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রীকে। বিএনপির এক নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী সায় দিয়েও বিষয়টি হালকা করে বলেন, তিনি জানেন, তাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার কথা হয়।

এদিকে গত রাতে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই মুলতবি হয়েছে। এরপর রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার প্রশ্নে আলোচনা হয়। তাতে বৈঠকে উপস্থিত বেশির ভাগ নেতাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়াই ভালো হবে বলে মত দেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পক্ষেও মত দেন তাঁরা। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মতামত নিতে স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী শনিবার কিংবা রবিবারের মধ্যে দলের এই দুই শীর্ষ নেতার নির্দেশনা বা পরামর্শ নেবেন ফখরুল। সূত্র মতে, শনিবারই ২০ দলীয় জোটের আরেক দফা বৈঠক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাতে দেরি হলে সে ক্ষেত্রে পরের দিন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

এদিকে বিএনপির নির্ভরযোগ্য আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তফসিল ও মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় দুই সপ্তাহ পেছানোর দাবি নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে যাবে।

এদিকে গতকাল আদালতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফখরুল কয়েক মিনিট কথা বলেন বলে জানা যায়। নাইকো মামলায় হাজিরা দিতে হাসপাতাল থেকে গতকাল পুরনো কারাগারে স্থাপিত বিশেষ আদালতে নেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। ওই সময় ফখরুল কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পান বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়। সূত্রে মতে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা আন্দোলনে যাওয়ার প্রশ্নে ঐক্যফ্রন্টের পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ফখরুলকে নির্দেশ দেন খালেদা জিয়া।



মন্তব্য