kalerkantho


ঐক্যপ্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির অপেক্ষা

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, কী হবে জামায়াতের

এনাম আবেদীন   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, কী হবে জামায়াতের

বিএনপির সঙ্গে উদারপন্থী দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও মূলত তিনটি ইস্যু এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। এগুলো হলো—জামায়াত প্রসঙ্গে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ণয়, কী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হবে তা চূড়ান্ত করা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন একসঙ্গে নাকি যুগপৎ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে হবে তা নির্ধারণ।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দল ও জোটের ভেতরে কাজ চলছে। আজ-কালের মধ্যেই যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের এসব নিয়ে বৈঠক করার কথা রয়েছে। এদিকে বিএনপি স্থায়ী কমিটিও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে। শনিবার ঐক্যপ্রক্রিয়ার কর্মসূচি পালন শেষে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকেও পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ ও অন্যান্য ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

গণফোরামের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার উদ্যোগে গত শনিবার মহানগর নাট্যমঞ্চে একত্রিত হয়েছে সরকারের বাইরে থাকা দল বিএনপি, বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য। ওই মঞ্চ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আগামী ১ অক্টোবর থেকে দলগুলো দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে ওই কর্মসূচি ঐক্যবদ্ধভাবে নাকি দলগুলো যুগপত্ভাবে পালন করবে তা জানানো হয়নি। দু-একটি দল ১ অক্টোবর থেকেই এক মঞ্চে থেকে কর্মসূচি পালনের পক্ষে। এ বিষয়ে দ্রুতই ঘোষণা আসবে বলে জানা গেছে।

এদিকে ঐক্যপ্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া ঘোষণাপত্রে জামায়াত প্রসঙ্গে কিছু বলা হয়নি। তবে সমাবেশে দেওয়া বত্তৃদ্ধতায় বিকল্পধারা প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন জামায়াত প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁরা বলেন, স্বাধীনতাবিরোধীরা সঙ্গে থাকলে ঐক্য হবে না। বি চৌধুরী ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়েও সুস্পষ্ট বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও যাতে এ ধরনের (আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার) সরকার ক্ষমতায় না আসতে পারে তার জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, যুক্তফ্রন্টসহ উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যে এ প্রশ্নে দুই ধরনের মত রয়েছে। একটি অংশ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঠেকিয়ে সংসদে আসন বণ্টনের মধ্য দিয়ে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। অন্য একটি অংশ আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতায় ভারসাম্য আনাসহ ক্ষমতা যাতে একদিকে ঝুঁকে না পড়ে তার জন্য বিএনপির লাগাম টানার পক্ষপাতী। অন্যদিকে এমন পরিস্থিতিতে উদারপন্থীদের শেষ পর্যন্ত কত আসনে বিএনপি ছাড় দেবে সে বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিকল্পধারা দেড় শ আসন চায় বলে গত আগস্ট মাসে গণমাধ্যমে খবর বের হয় এবং একই সময় দলটির প্রেসিডেন্ট বি চৌধুরী গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েও এর সত্যতা নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া যুক্তফ্রন্টের আরেক শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাও সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রশ্নে উদারপন্থী দলগুলোকে দুই বছরের জন্য সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেন। তবে এসব প্রস্তাব এখনো আলোচনার পর্যায়ে ঘুরপাক খাচ্ছে বলে বিএনপি সূত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়ার অনেক দূর অগ্রগতি হয়েছে। যেসব ইস্যু নিষ্পত্তির বাকি আছে তাও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে। তাঁর মতে, ‘এ ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ চূড়ান্ত রূপ নিতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। তবে আমরা প্রায় চূড়ান্ত ঐক্যের কাছাকাছি।’

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া শনিবার থেকে শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারব।’ তিনি আরো বলেন, ‘ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়টিতে আলাপ-আলোচনা চলছে। দুই-এক দিনের মধ্যে এ ইস্যুতেও বৈঠক হবে। অন্যান্য ইস্যুও আলোচনার মধ্য দিয়ে ফলপ্রসূ হবে বলে আশা রাখি।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে জানান, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি লম্বা আলোচনার বিষয়। তাই একবারে, এক বৈঠকে এ ধরনের ইস্যু নিষ্পত্তি হবে না। আলোচনার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এটি ঠিক করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ নাকি যুগপত্ভাবে হবে—এ নিয়ে আমরা ভাবছি।’

এদিকে উদারপন্থীরা নীতিগতভাবে মনে করছেন যে জামায়াত সঙ্গে থাকলে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করা সম্ভব নয়। তবে এ ক্ষেত্রে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে মতের ফারাক রয়েছে বলে জানা যায়। গণফোরামসহ অন্যরা বৃহত্তর ঐক্যে জামায়াত না থাকলেই খুশি। কিন্তু ২০ দলীয় জোট থেকে দলটিকে ‘চাপ দিয়ে’ বিদায় করতে হবে—এমন কঠোর অবস্থান নিতে তারা রাজি নয়। যে কারণে শনিবার বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার ঘোষণাপত্রে জামায়াতের প্রসঙ্গ রাখা হয়নি। পাশাপাশি বিএনপিরও নীতিগত অবস্থান হলো, বৃহত্তর ঐক্যে জামায়াতকে সম্পৃক্ত না করা। কিন্তু ২০ দলীয় জোটে তারা থাকুক, ঠেলে তাদের বিদায় করার দরকার নেই। কিন্তু বিকল্প ধারা আবার এ প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে আছে। শনিবারের বক্তব্যেও বি. চৌধুরী সেটি স্পষ্ট করেন। 

২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকলে আপত্তি আছে কি না জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাপারগুলো আমরা এভাবে বিবেচনা করি না। জামায়াত থাকলে আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকব না এটি বিএনপিকে স্পষ্ট করে বলেছি। এখন এর ব্যাখ্যা তারা করুক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি জামায়াতকে বৃহত্তর ঐক্যে টানব না অথবা ওরা আসবে না। বিএনপিকেও বলেছি, তারা জামায়াতকে এখানে টানবে না।’

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘জামায়াত থাকলে নীতিগতভাবে আমরা এমন ঐক্যের বিরোধী। কিন্তু এটিকে আমরা আবার পয়েন্ট বানাতে চাই না।’ তাঁর মতে, চাপ দিলে ২০ দল ভেঙে ১৯ দল হবে। কিন্তু নিবন্ধন না থাকায় জামায়াত ইচ্ছা করলে আবার যেকোনো দলের সঙ্গে মোর্চা করতে পারে।

বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশা করি বিএনপি জামায়াতকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বৃহত্তর ঐক্যে আসবে। কিন্তু জামায়াতকে বাদ না দিলে বৃহত্তর ঐক্যে বিএনপি থাকবে কি না তা সময় বলে দেবে।’

জানা গেছে, ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত সুধীসমাজের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতার বৈঠকে সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সুধীসমাজের ওই প্রতিনিধি জামায়াতকে বুঝিয়েছেন যে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে জামায়াতের নীরব থাকা উচিত। তিনি বলেন, জামায়াতের কাছে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে তারা যেন বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখায় এবং বিএনপিকে পাল্টা চাপ না দেয়। তবে নির্বাচনের সময় বিএনপির সঙ্গে আসন নিয়ে জামায়াতের সমঝোতা হবে বলেও মনে করেন ওই প্রতিনিধি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, জামায়াত ইস্যু নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, জামায়াত বিএনপিকে বলে দিয়েছে যে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যা যা প্রয়োজন বিএনপি যেন সেসব উদ্যোগ নেয়। তাদের ছাড়াও বৃহত্তর ঐক্যে আপত্তি নেই।



মন্তব্য