kalerkantho


কোটা সংস্কারের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উঠবে ১ অক্টোবর

আশরাফুল হক   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কোটা সংস্কারের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উঠবে ১ অক্টোবর

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য গঠিত সচিব কমিটির প্রস্তাব আগামী ১ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। কোটা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সেখানেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

কোটা সংস্কারসংক্রান্ত সচিব কমিটি গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাদের প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সেই প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোটা সংস্কারের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের কারণে আগামী সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠক হবে না। পরবর্তী বৈঠক হবে ১ অক্টোবর। মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ওই সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোটা সংস্কারসংক্রান্ত সচিব কমিটি সুপারিশ করার আগে প্রতিবেশী চার দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে ভারতের কয়েকটি প্রদেশেরও সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। ভারতের একেক রাজ্যে একেক ধরনের কোটা পদ্ধতি চালু রয়েছে। শ্রীলঙ্কায়ও কোটা রয়েছে এবং ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা যায়। মালদ্বীপ ও নেপালেও কোটা পদ্ধতি আছে। তবে ওই সব দেশের কোটা পদ্ধতি বাংলাদেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কঠিন।

সচিব কমিটি বাংলাদেশের ভেতরে প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত কমিশন বা কমিটির প্রতিবেদনও আমলে নিয়েছে। একুশ শতকের উপযোগী জনপ্রশাসন গড়ার জন্য গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও কোটা পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে বিলোপ করার সুপারিশ করা হয়েছে। ২০০০ সালে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দীর্ঘকাল ধরে সিভিল সার্ভিসে জেলা কোটার সুবাদে উৎকৃষ্টদের ডিঙিয়ে নিম্ন মেধার লোকেরা নিয়োগ পাচ্ছে। কর্মজীবনে মেধাভিত্তিক উন্নতির জন্য এ সূচনা অশুভ হতে বাধ্য।’ জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও সরকারি চাকরি থেকে কোটা তুলে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে কোটা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। গত বুধবার কমিটির বৈঠকে প্রতিবন্ধী আইনে দেওয়া সুবিধার প্রতিফলন ঘটাতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ১ শতাংশ কোটা রাখা হয় অন্যান্য কোটার ৫৫ শতাংশের অপূরণকৃত পদের মধ্য থেকে। কাজেই মূল কোটাই যেখানে না থাকার সম্ভাবনা প্রবল, সেখানে প্রতিবন্ধী কোটা বহাল রাখা কঠিন। তাঁরা আরো জানান, সরাসরি কোটা তুলে দিলেও সরকার কয়েক বছর পর পর বিশেষ বিসিএস আয়োজন করবে। বিশেষ ব্যবস্থায় বিশেষ শ্রেণির লোকদের চাকরি দেওয়া হবে। এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক নিয়োগের জন্য, চিকিৎসকসহ কারিগরি পেশায় নিয়োগের জন্য বিশেষ বিসিএস আয়োজন করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম গত ১৭ অক্টোবর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সচিব কমিটি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অর্থাৎ নবম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত চাকরিতে কোটা তুলে দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিষয়টি মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

বর্তমানে কোটা সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার ক্ষেত্রে কোটা বাতিল করা হলে ভবিষ্যতে যে প্রভাব পড়বে তা নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্যালোচনা করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশও করেছে সচিব কমিটি।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ৫৫ শতাংশ কোটা রয়েছে। বাকি ৪৫ শতাংশ নেওয়া হয় মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে। বিসিএসসহ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০, জেলা কোটায় ১০, নারী কোটায় ১০ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা ৫ শতাংশ অনুসরণ করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ৪৫ শতাংশ মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া হলেও তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে মেধাবীদের কোনো জায়গা নেই। এই দুই শ্রেণিতে অনাথ ও প্রতিবন্ধী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০, মহিলা কোটা ১৫, উপজাতি ৫, আনসার ও ভিডিপি ১০ এবং সাধারণ বা জেলা কোটা ৩০ শতাংশ।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ৫৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে কয়েক মাস ধরে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’। তাদের সেই আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধও করছিল তারা। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয় আন্দোলনকারীদের। গ্রেপ্তার হন আন্দোলনকারী অনেক নেতা।

কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী কোটাব্যবস্থা বাতিল করার ঘোষণা দেন। গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এত কিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনো কোটারই দরকার নেই। যারা প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করব।’

প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরই গুরুত্বপূর্ণ সচিবদের নিয়ে সচিব কমিটি গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদসচিবের নেতৃত্বে গঠিত কোটা পর্যালোচনা কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পিএসসির সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব।



মন্তব্য