kalerkantho


জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেই বিচার চলবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেই বিচার চলবে

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত আদালতে গতকাল বৃহস্পতিবারও হাজির হননি। এ নিয়ে পরপর তিনটি ধার্য তারিখে গরহাজির থাকলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এ অবস্থায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচার চলবে বলে আদেশ দিয়েছেন বিচারিক আদালত। ঢাকার বিশেষ আদালত-৫-এর বিচারক ড. মো. আক্তারুজ্জামান গতকাল এ আদেশ দেন। সেই সঙ্গে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে।

গতকাল কারাগার থেকে হাজতি পাঠানো পরোয়ানায় কারা কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে, খালেদা জিয়া অস্থায়ী আদালতে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে মামলার বিচার চলবে কি না সে বিষয়ে আদেশের জন্য গতকাল দিন ধার্য ছিল। দুপুরে শুনানির সময় আদালত বলেন, ‘খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হয়ে ৫ সেপ্টেম্বর বলেছেন, তিনি বারবার আদালতে আসতে পারবেন না। এরপর ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর এবং আজও খালেদা জিয়া কারাগার কর্তৃপক্ষকে বলেছেন, তিনি আদালতে আসতে পারবেন না। অর্থাৎ আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে খালেদা জিয়া আদালতে আসতে অনিচ্ছুক। অথচ মামলার দুই আসামি প্রতিদিন হাজির হচ্ছেন। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হননি। এমন অবস্থায় ন্যায়বিচারের স্বার্থে খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁকে জামিনে রেখে বিচার চলবে।’

শুনানির শুরুতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া ও মাসুদ আহমেদ তালুকদার আদালতকে বলেন, গতকাল খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁরা দেখা করেছেন। খালেদা জিয়া তাঁদের বলেছেন, তিনি আদালতে আসতে চান। কারাগার কর্তৃপক্ষ আদালতের কাছে যে কথা বলেছে তা ঠিক নয়। বাস্তবে সুস্থ হলে তিনি আদালতে হাজির হবেন। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিচার চলার আদেশ চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী যে দরখাস্ত দিয়েছেন তা তিনি পারেন না।

আইন ও উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে আদালত বলেন, এক বা একাধিক আসামি যদি অনুপস্থিত থাকে, সে ক্ষেত্রে যদি কোনো পক্ষ আবেদন নাও করে তাহলেও আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দিতে পারেন। খালেদা জিয়া না আসায় বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। এ মামলায় এক বছর ৯ মাস ধরে যুক্তিতর্ক শুনানি চলছে। খালেদা জিয়া না আসায় যুক্তিতর্ক শুনানি হচ্ছে না। আদালত আদেশে আরো বলেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে আইনজীবীরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন।

শুনানির সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘খালেদা জিয়া আদালতে আজও (বৃহস্পতিবার) আসতে চাননি। আদালতকে তিনি সহযোগিতা করছেন না। অন্য দুই আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য আছে। অথচ তাঁদের পক্ষে যুক্তিতর্ক করা হচ্ছে না।’

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার পক্ষে তাঁর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া জামিন স্থায়ী করার আবেদন দাখিল করেন। আদালত খালেদার জামিন বহাল রাখেন।

বিচারক বলেন, সাত বছর ধরে এ মামলার বিচার চলছে। মামলার বিচার চলার সময় শুরু থেকে আসামিরা ৪০ বার, যুক্তিতর্ক চলার সময় ৩২ বার সময় নিয়েছেন। এভাবে সময় পেছানো হলে মামলাটি দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থেকে যাবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে আসামির হাজিরা মওকুফের উদাহরণ দিতে গিয়ে ভারতের রাজস্থান, ওড়িশা ও অন্ধ্র প্রদেশের তিনটি রায়ের প্রসঙ্গ টানেন বিচারক। তিনি বলেন, ‘কোনো পক্ষ আবেদন না করলেও আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং বিচার যেন বিলম্বিত না হয় সে জন্য হাজিরা মওকুফ করতে পারেন। কেউ দরখাস্ত না দিলেও ৫৪০ (এ) ধারায় কারো মৌখিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কারো হাজিরা মওকুফ করতে পারেন আদালত।’

এ মামলার আসামি খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে বিচারক বলেন, ‘নথিপত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে আসামি ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতে হাজির হচ্ছেন না। এটা বিচার বিঘ্নিত ও বিলম্বিত করতে পারে।’

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪০ (এ) ধারার (১) অংশে বলা আছে, দুই বা ততোধিক আসামি আদালতে হাজির থাকলে এই বিধির অধীন অনুসন্ধান বা বিচারের যেকোনো পর্যায়ে জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট যদি কোনো কারণবশত সন্তুষ্ট হন যে আসামিদের এক বা একাধিক আদালতে হাজির থাকতে অসমর্থ, তাহলে ওই কারণ লিপিবদ্ধ করে আসামির কৌঁসুলি হাজির থাকলে আসামিকে হাজিরা হতে রেহাই দিতে এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে অনুসন্ধান বা বিচার চালিয়ে যেতে পারবেন এবং কার্যধারার পরবর্তী পর্যায়ে ওই আসামিকে ব্যক্তিগতভাবে হাজির থাকতে নির্দেশ দিতে পারবেন। ওই ধারায় (২) অংশে বলা হয়েছে, ‘এইরূপ কোনো মামলায় আসামির কৌঁসুলি না থাকলে, অথবা জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট যদি আসামির হাজিরা প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে তিনি উপযুক্ত মনে করলে অনুসন্ধান বা বিচার মুলতবি রাখতে পারবেন, অথবা উক্ত আসামির মামলা পৃথকভাবে গ্রহণ করার বা বিচারের আদেশ দিতে পারবেন।’

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেন যে যেহেতু আসামি কারাবন্দি, তার ক্ষেত্রে ৫৪০ (এ) ধারা কার্যকর হতে পারে না। সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) বলেছেন, তিনি অসুস্থ। তাঁর পক্ষে আদালতে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ বলেছেন, তিনি অনিচ্ছুক। তিনি আমাদের বলেছেন, অন্য আসামিদের যুক্তিতর্ক তিনি শুনতে চান। তিনি আদালতে উপস্থিত থাকতে চান। তিনি সুস্থ হলে অবশ্যই আদালতে আসবেন। তাঁর জামিন বৃদ্ধি কমর দেন। তিনি সুস্থ হলে আদালতে আসবেন।’

খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার আদালতকে বলেন, ‘আপনি তাঁর জামিন বৃদ্ধি কমর দেন। কারা কর্তৃপক্ষ বলেছে, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সে অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসা হোক।’

৫৪০ (এ) ধারার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য খালেদার আইনজীবীরা সময়ের আবেদন করলে বিচারক বলেন, ‘আজকে আদেশের জন্য দিন নির্ধারিত আছে। আজকে বক্তব্য শুনব কেন? ১৩ তারিখে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। ওই দিন আপনারা দেননি। আজকে আমরা বক্তব্য নেব না।’

এ নিয়ে বাদানুবাদের একপর্যায়ে আসামি জিয়াউল হক মুন্নার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কি দেবতা? তিনি ওই দিন পিটিশন চেয়েছেন, আর ওই দিনই আমাদের ওই বিষয়ে বক্তব্য দিতে হবে। এখানে লাইব্রেরি নেই, বইপত্র নেই। প্রস্তুতি ছাড়া ওই দিনই কিভাবে বক্তব্য দেই?’ এখন আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ব্যাখ্যা না শুনলে তা ‘ন্যায়বিচারের পরিপন্থী’ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এরপর আদালত তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিলে আমিনুল ইসলাম পাকিস্তানের একটি উদাহরণ টেনে বলেন, “কাস্টডির আসামির ক্ষেত্রে ৫৪০ (এ) ধারা কার্যকর হবে না। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘উনি অনিচ্ছুক’। আর আইনে আছে, ‘তিনি যদি সক্ষম না হন’। এ দুটি সাংঘর্ষিক ব্যাপার।”

মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, ৫৪০ (এ) ধারায় বলা আছে, ‘আসামি অক্ষম হলে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে তাঁর হাজিরা হবে। আমরা আসামিকে রিপ্রেজেন্ট করছি না। উনি কাস্টডিতে আছেন। উনাকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ আমাদের নাই। আমরা তাকে এখানে শুধু ডিফেন্ড করছি।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান মানিক কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো আসামির অনুপস্থিতিতে মামলার বিচারকাজ চলার আদেশ দিলে তাতে আইনের ব্যত্যয় ঘটে না। ঠিক এ কারণেই খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলার পক্ষে বিচারক যে আদশ দিয়েছেন তা আইন অনুযায়ীই হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো আসামি যদি দিনের পর দিন আদালতে হাজির না হন তাহলে তাঁর জন্য মামলার বিচারকাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য থেমে থাকতে পারে না।

গত ৫ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে এই আদালতে হাজির করা হয়েছিল। সেদিন তাঁর আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত হননি। খালেদা জিয়া ওই দিন আদালতে বলেছিলেন, ‘এই আদালতে ন্যায়বিচার নেই। অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ন্যায়বিচার করা হয়নি। আদালত যা ইচ্ছে তাই সাজা দিতে পারেন। যত ইচ্ছে সাজা দিতে পারেন। আমি অসুস্থ। আমি বারবার আদালতে হাজির হতে পারব না। আমার সিনিয়র আইনজীবীরা আসেননি। এটা জানলে আমি আসতাম না।’ 

এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডে পরিত্যক্ত কারাগারে অস্থায়ী আদালত বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া পরিত্যক্ত এই কারাগারের একটি ভবনে বন্দি আছেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন একই আদালত। ওই রায় ঘোষণার আগে থেকেই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি চলছিল। কিন্তু জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার পর খালেদাকে আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজির করা যায়নি। নির্ধারিত তারিখে হাজির না হওয়ায় মামলার শুনানি বারবার পেছাতে হয়েছে। এ কারণে পরিত্যক্ত কারাগারেই নতুন অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধভাবে লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করেছিল দুদক। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি এ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয় আদালতে। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

কুমিল্লার মামলায় জামিনের শুনানি ৩০ সেপ্টেস্বর

কুমিল্লা থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, জেলার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় আট যাত্রী হত্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের ওপর শুনানি পিছিয়ে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার ৫ নম্বর আমলি আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মাহবুব খান গতকাল এ আদেশ দেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া বয়োবৃদ্ধ, গুরুতর অসুস্থ এবং তিনি দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আমরা তাঁর জামিন চেয়েছি, কিন্তু একাধিকবার তাঁর জামিন আবেদনের শুনানি পেছানো হয়েছে। আদালত তাঁর জামিন শুনানির দিন পিছিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করেছেন। আমরা আশা করি আদালতে ন্যায়বিচার পাব।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের ডাকা লাগাতার হরতাল-অবরোধ চলাকালে ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি নৈশকোচ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জগমোহনপুরে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। এতে আগুনে পুড়ে বাসের ঘুমন্ত আট যাত্রী মারা যায়। এ ঘটনায় চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই নুরুজ্জামান হাওলাদার বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি মামলা করেন। ওই দুটি মামলায় গত বছরের ৬ মার্চ আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।



মন্তব্য