kalerkantho


রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রতিবেদন জাতিসংঘে

মিয়ানমারের বিচার ছাড়া শান্তি আসবে না

মেহেদী হাসান   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মিয়ানমারের বিচার ছাড়া শান্তি আসবে না

রাখাইন রাজ্যকে রোহিঙ্গাশূন্য করতে রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা আর নারীদের ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতন চালিয়েছে মিয়ানমার বাহিনী। মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ সত্যানুসন্ধানী দল গতকাল মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধবিষয়ক ৪৪৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন ও সুপারিশ উত্থাপনকালে এ তথ্য জানায়। প্রতিবেদনটিতে মিয়ানমার বাহিনীর অপরাধ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অন্তত ৫১ বার ‘গণহত্যা’, ৬৯ বার ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং ২৫ বার ‘যুদ্ধাপরাধ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সত্যানুসন্ধানী দল এর আগে গত ২৭ আগস্ট ২০ পৃষ্ঠার একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

মানবাধিকার পরিষদের গতকালের অধিবেশনে সত্যানুসন্ধানী দলের নেতা মারজুকি দারুসমান রাখাইনের তুলাতলি গ্রামে গণহত্যার তথ্য তুলে ধরে পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা, নারীদের গণধর্ষণ, শিশুদের পানিতে বা আগুনে ছুড়ে হত্যার কথা জানান। তিনি বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মিয়ানমারে বেসামরিক সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত হামলা।

মারজুকি দারুসমান বলেন, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ‘তাতমাদো’ ধর্ষণকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। ৮০ শতাংশ রোহিঙ্গা নারী দলগত ধর্ষণের (গ্যাং রেপড) শিকার হয়েছে। ৪০ শতাংশ রোহিঙ্গা নারী দলগত গণধর্ষণের শিকার (মাস গ্যাং রেপড) শিকার। এটি পরিকল্পিত নয়, এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ এখনো এমন ঘটনা ঘটছে দেশটির কাচিন ও শানে। রাখাইনে কম করে হলেও ১০ হাজার রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাতমাদো দেশটিতে বিচারের ঊর্ধ্বে। যে পর্যন্ত তাতমাদোর বিচার না হবে সে পর্যন্ত শান্তি অর্জিত হবে না।

মারজুকি দারুসমানের সঙ্গে সত্যানুসন্ধানী দলের অন্য দুই সদস্য রাধিকা কুমারাস্বামী ও ক্রিস্টফার সিডোটিও মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সবাই মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ সামরিক অভিযান সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ ছয় কর্মকর্তার বিচার এবং তদন্ত কাঠামোর সুপারিশ করেন। সত্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা তাঁদের প্রতিবেদন নিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রশ্নেরও জবাব দেন। মানবাধিকার পরিষদের বেশির ভাগ সদস্যই তাঁদের সুপারিশের প্রতি সমর্থন জানান।

মারজুকি দারুসমান বলেন, গত বছর আগস্ট মাসে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল আক্ষরিক অর্থেই অগ্নিশিখায় পরিণত হয়েছিল। ধ্বংস করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের ৩৭ হাজার বাড়িঘর। তিনি বলেন, ‘দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে বলতেই হচ্ছে, পরিস্থিতি যে এতটা ভয়াবহ তা আমরা শুরুতে ভাবিনি। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সুস্পষ্ট আলামত থাকার মতো উপসংহারে আমাদের পৌঁছাতে হয়েছে।’

মারজুকি দারুসমান সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে উত্থাপিত তথ্যগুলোর সত্যতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাঁদের পাওয়া তথ্যগুলো অপরাধীদের নয়, বরং অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পক্ষেই কথা বলে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো স্থান নেই। তাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মিয়ানমার সরকারের চাপিয়ে দেওয়া বঞ্চনার মধ্যে চলতে হয়। তিনি বলেন, ২০১২ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য প্রচারণার মাধ্যমে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হয়। ২০১৫ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী অপপ্রচারে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে।

মারজুকি দারুসমান বলেন, রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’, ‘বেঙ্গলি’, ‘কালা’—এসব নামে ডাকা হয়। ধর্মীয় স্কুল, মিলিটারি একাডেমিতে এগুলো পড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এগুলো প্রচার করা হয়। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর গত বছর বিধিনিষেধ আরো বেড়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্টে অভিযান শুরুর আগে প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা হয়। তিনি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অন্যান্য অধিকারসহ আন্তর্জাতিক নজরদারির ব্যবস্থা রেখে মিয়ানমারে ফেরানোর ওপর জোর দেন।

জাতিসংঘ সত্যানুসন্ধানী দলের নেতা বলেন, ‘জেনোসাইডের’ (গণহত্যা) সব শর্তই মিয়ানমার পূরণ করেছে। মিয়ানমারের সেনাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল—সেনাপ্রধানসহ এমন ছয় কর্মকর্তাকে তাঁরা চিহ্নিত করেছেন। তাদের বিচার করতেই হবে।

সত্যানুসন্ধানী দল জাতিসংঘের জন্য পাঁচটি সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো ১. মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের হোতাদের জন্য বিচারিক কাঠামো সৃষ্টি, ২. অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও কেস ফাইল তৈরি, ৩. মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে আরো সহায়তা প্রদান, ৪. মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের জন্য তহবিল গঠন এবং ৫. সত্যানুসন্ধানী দলের মেয়াদ বৃদ্ধি।

মিয়ানমারের প্রতিনিধি তাঁর বক্তব্যে সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনকে ‘একপেশে’ অভিহিত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তবে এর প্রতিক্রিয়ায় সত্যানুসন্ধানী দলের সদস্য রাধিকা কুমারাস্বামী বলেন, তাঁর দল কোনো একক উেসর ওপর নির্ভর করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেনি। তাঁরা তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেছেন। রোহিঙ্গাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করেছেন।

তাতমাদোর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ নতুন কিছু নয় উল্লেখ করে রাধিকা কুমারাস্বামী মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির এক বক্তৃতার প্রসঙ্গ টানেন। বর্তমানে মিয়ানমার বাহিনীর পক্ষে সাফাই গাওয়া সু চি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে ২০১১ সালে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, তাঁর দেশ মিয়ানমারে যারা শান্তি চায় তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তাই তাতমাদোর ধর্ষণের স্বীকারোক্তি সু চির বক্তব্যেই আছে। সত্যানুসন্ধানী দলের অন্য সদস্য ডমিনিক সিডোটি বলেন, রোহিঙ্গা নিপীড়নের জন্য মিয়ানমারের জবাবদিহি অপরিহার্য, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

মিয়ানমার থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সিডোটি বলেন, সেটিও মিয়ানমার সংকট সমাধানে যথেষ্ট নয়। কারণ এটি শুধু রাখাইন থেকে বহিষ্কার ইস্যুটিই দেখবে। তাই মিয়ানমারের ভেতর রাখাইনসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধগুলোর বিচারের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

মিয়ানমারের প্রতিনিধি গতকাল মানবাধিকার পরিষদে অভিযোগ করেছেন, সত্যানুসন্ধানী দল মিয়ানমারে অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এর স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ডমিনিক সিডোটি বলেন, সত্যানুসন্ধানী দল নয়, বরং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই ৭০ বছর মিয়ানমারে অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এখন সময় এসেছে মিয়ানমারের রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সামরিক বাহিনীকে বের করে দেওয়ার। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দায়মুক্তিতে শান্তি আসবে না। গণহত্যা, মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের ওপর ভিত্তি করে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারে না।

সত্যানুসন্ধানী দল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার বাহিনীর নির্মূল অভিযানে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ৩৯২টি গ্রাম পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। অভিযান শুরুর পর থেকে এ বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত সাত লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এখন রাখাইনে সহিংসতা ও নিপীড়ন চলছে। এ কারণে প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার ৭৩৩ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে। সু চির সরকার জাতিসংঘ সত্যানুসন্ধানী দলকে মিয়ানমারে ঢুকতে দেয়নি। ওই দলটি পরে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশে গিয়ে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া লোকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে।

সত্যানুসন্ধানী দল তাদের প্রতিবেদনে রাখাইনে ৯টি হত্যাযজ্ঞের তথ্য যাচাই করেছে এবং বিশদভাবে তুলে ধরেছে। তারা ৫৪টি সহিংস ‘নির্মূল অভিযানের’ তথ্য যাচাই করেছে। রোহিঙ্গাদের ‘নির্মূল অভিযানের’ নেতৃত্বে ছিল মিয়ানমার বাহিনীর ৩৩ ও ৯৯তম লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন। তাদের সঙ্গে প্রায়ই অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী ও বেসামরিক সহযোগীরাও অংশ নিয়েছে।

সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যকে মর্মান্তিক ও ভয়ংকর বলে অভিহিত করেছে বেশির ভাগ দেশ। মানবাধিকার পরিষদে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও এর সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বলেছেন, সত্যানুসন্ধানী দলের সুপারিশগুলো তাঁরা এই অধিবেশনেই প্রস্তাব আনবেন। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং বেশির ভাগ দেশ মিয়ানমারের বিচার, তদন্ত কাঠামো সৃষ্টির পক্ষে মত দিয়েছে। তবে চীন, রাশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় কয়েকটি দেশ মানবাধিকার পরিষদকে স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানোর এবং মিয়ানমারকে সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছে। মিয়ানমার ছাড়া সবাই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে। একমাত্র মিয়ানমার বলেছে, প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।



মন্তব্য