kalerkantho


প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিলের সুপারিশ

♦ ১৪ থেকে ২০তম গ্রেডে কোটা নিয়ে কোনো সুপারিশ নেই
♦ ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আন্দোলনকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিলের সুপারিশ

ফাইল ছবি

সরকারি চাকরির নবম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির) বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের কোটা বাতিলের সুপারিশ করেছে কোটা পর্যালোচনাসংক্রান্ত সচিব কমিটি। এসব পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নিয়ম চালু করার সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এসংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সচিব কমিটি। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদসচিব এ তথ্য জানান।

সচিব কমিটির সুপারিশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন গ্রহণ করা হবে। অনুমোদনের পর তা মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন করলে প্রজ্ঞাপন জারি করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

এদিকে সচিব কমিটির এই প্রতিবেদনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অন্য যে গ্রেডগুলো রয়েছে সেখানেও যৌক্তিকভাবে কোটার সহনীয় সংস্কার করার দাবি জানিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ‘কোটা সংস্কারে ফাইল চালাচালি’ না করে প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়ে তারা আজ মঙ্গলবার সকাল ১১টায় সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারি না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছে আন্দোলনকারীরা।

কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে গত ২ জুলাই কোটাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে তা সংস্কার বা বাতিলের বিষয়ে সুপারিশ দিতে মন্ত্রিপরিষদসচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটিকে ১৫ কর্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। পরে কমিটির মেয়াদ আরো ৯০ কার্যদিবস বাড়ানো হয়। কার্যপরিধিতে না থাকায় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১৪তম থেকে ২০তম গ্রেডে) নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা নিয়ে কোনো সুপারিশ করেনি কমিটি।

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ইতিমধ্যে রিপোর্ট জমা দিয়েছি। আমাদের সুপারিশ হলো—নবম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত অর্থাৎ আগে যেটাকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি বলা হতো, সেগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোটা থাকবে না। নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে। আমাদের রিপোর্ট অনেক বড়, তবে ফাইন্ডিংস খুব ছোট।’

সম্প্রতি জারি করা ৪০তম বিসিএসের বেলায় কী হবে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ৪০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তিতেই বলা আছে সরকার যদি ভিন্নরূপ সিদ্ধান্ত নেয় সেই অনুযায়ী কোটা নির্ধারিত হবে।

সচিব কমিটির প্রতিবেদনে অন্যান্য কোটার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কোটা তুলে দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ রয়েছে বলে এত দিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণ নিয়ে আদালতের পর্যাবেক্ষণের বিষয়ে কী সুপারিশ করেছেন জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘আমরা আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছি, তাঁরা বলেছেন, এটা যেহেতু সরকারের নীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তাই এটা আদালতের রায়কে স্পর্শ করবে না। তাই কোনো সমস্যা দেখছি না।’

প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছিলেন। এ বিষয়ে সচিব কমিটির মতামত কী জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, সচিব কমিটি ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এখন আর পিছিয়ে পড়া কোনো জনগোষ্ঠী নেই। সবাই এগিয়ে গেছে। তাই তাদের জন্য কোনো কোটা রাখার সুপারিশ করা হয়নি।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে বেতন কাঠামোর ২০টি গ্রেড রয়েছে। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তরা নবম গ্রেডে যোগদান করেন। এরপর ধাপে ধাপে পদোন্নতির মাধ্যমে প্রথম গ্রেডে উন্নীত হন।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ৫৫ শতাংশ কোটা রয়েছে। বাকি ৪৫ শতাংশ নেওয়া হয় মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে। বিসিএসসহ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০, জেলা কোটায় ১০, নারী কোটায় ১০ এবং উপজাতি কোটায় ৫ শতাংশ অনুসরণ করা হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে পুরোটাই কোটার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই দুই শ্রেণিতে অনাথ ও প্রতিবন্ধী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০, মহিলা কোটা ১৫, উপজাতি ৫, আনসার ও ভিডিপি ১০ এবং সাধারণ বা জেলা কোটা ৩০ শতাংশ।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটার পরিমাণ ৫৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে কয়েক মাস আগে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধও করেছিল তারা। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয় আন্দোলনকারীদের। গ্রেপ্তার হন আন্দোলনকারী অনেক নেতা।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কোটাব্যবস্থা বাতিলের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এত কিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনো কোটারই দরকার নেই। যারা প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করব।’

মন্ত্রিপরিষদসচিবের নেতৃত্বে গঠিত কোটা পর্যালোচনা কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব মুসলিম চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব অপরূপ চৌধুরী, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব।

প্রজ্ঞাপনের দাবিতে আজ সারা দেশে বিক্ষোভ

গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল সব চাকরির ক্ষেত্রে যে কোটা পদ্ধতি রয়েছে তার একটি যৌক্তিক সংস্কার। সচিব নবম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত বাতিলের যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, সেটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এর পাশাপাশি যে গ্রেডগুলো রয়েছে সেখানে যৌক্তিকভাবে কোটার সহনীয় সংস্কার করা হোক, সেই দাবিও আমরা জানাই।’ কোটা সংস্কার প্রজ্ঞাপন আকারে জারি না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।

সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছি, যেদিন আমাদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়িত হবে সেদিনই আমরা আন্দোলন থেকে সরে যাব। ফাইল চালাচালির ওপর আমাদের ছাত্রসমাজের কোনো আস্থা নেই, তাই ফাইল চালাচালি না করে প্রজ্ঞাপন জারি করুন।’ এ সময় তিনি তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো—ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক সব মামলা প্রত্যাহার; হামলাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিতকরণ এবং পাঁচ দফার আলোকে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি। তিনি প্রজ্ঞাপনের দাবিতে সারা েদশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক বিন ইয়ামিন মোল্লা, আতাউল্লাহ, রাতুল সরকার প্রমুখ।



মন্তব্য