kalerkantho


যে বীরত্ব চিরদিনের

‘আমি তখন অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম’

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘আমি তখন অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম’

বাঁ হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। তাই ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে অন্য আঙুলগুলো একে একে ধরছেন আর কী যেন গুনছিলেন তামিম ইকবাল। গোনা শেষে বললেন, ‘এ নিয়ে দুই হাত মিলিয়ে সাতবার চোটে পড়লাম।’ অর্থাৎ এই ওপেনারের ইনজুরির ইতিহাসও মাশরাফি বিন মর্তুজার দুই হাঁটুর মতো হতাশার গল্পগাথা হওয়ার পথে। সেই হতাশা কাল দুপুরে ফেস্টিভাল সিটির ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বারবার প্রকাশিত হচ্ছিল তামিমের চেহারায়, অভিব্যক্তিতে ও কথায়। হেড কোচ স্টিভ রোডস তাঁর ক্যারিয়ার ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে নিষেধ করলেও এক বলের জন্য এক হাতে ব্যাটিংয়ে নেমে যাওয়ার পরদিন দুপুরেও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত তামিম জানালেন ওই বীরোচিত ঘটনার পূর্বাপর। 

প্রশ্ন : জীবনে এর আগেও বহুবার হিরো হয়েছেন। তবে সেসব সেঞ্চুরি করে দলকে ম্যাচ কিংবা সিরিজ জিতিয়ে। কিন্তু এবারের হিরো হওয়াটা একেবারেই ভিন্ন মাত্রার। এই কবজির ব্যথা নিয়েও কি সেটি অন্য রকম এক অনুভব দিচ্ছে না?

তামিম ইকবাল : সত্যি কথা, এটা আমি এক ফোঁটাও উপভোগ করছি না। আমি ভীষণ হতাশ। আমার ১০-১১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মনে হয় না এর চেয়ে বেশি হতাশ আমি কখনো হয়েছি। একেবারে হার্টব্রোকেন বলতে যা বোঝায়, তাই। এশিয়া কাপে এসেছিলাম অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু এভাবে ছিটকে পড়াটা দুঃখজনক। কাল রাত থেকেই তাই ভীষণ মন খারাপ করে আছি।

প্রশ্ন : জেনেছি যে শেষ পর্যন্ত ওভাবে এক হাতে ব্যাটিং করতে নেমে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছিল আপনার দিক থেকেই। কী ভাবনা থেকে বিস্ময়কর ব্যাপারটি ঘটিয়ে ফেললেন?

তামিম : আসলে মাথায় তখন এটাই ঘুরছিল যে এশিয়া কাপে বাংলাদেশ যা-ই করুক, আমি আর তার অংশ হতে পারব না। এই এশিয়া কাপে আমি আর কোনো ভূমিকা রাখতে পারব না। তাই আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব ছিল, আমি ঠিক ততটুকুই করেছি। মনে হয়েছিল, এশিয়া কাপে যদি আমার ভাগ্যে মাত্র একটি বলই লেখা থাকে, তাহলে ওই বলটিই আমি খেলব না কেন! এটা ছিল ওই সময়ে ব্যাটিংয়ে নেমে এক বল খেলার সবচেয়ে বড় কারণ। আমি নামার পর ৩২ রান যোগও হয়েছে। দলের জন্য ভালো কিছুই হয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে আমার হৃদয়টা ভেঙে গেছে। 

প্রশ্ন : হাসপাতাল থেকে ফেরার পর দলের কী অবস্থা দেখেছিলেন?

তামিম : হাসপাতালে যখন ছিলাম, তখন তো মিঠুন আর মুশফিকের পার্টনারশিপে ভালোই যাচ্ছিল। এরপর দ্রুত কিছু উইকেট পড়ে গেল। আমিও হাসপাতাল থেকে ফিরলাম। ফিরে ফিজিও থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদের যা জানানোর জানালাম। এর মধ্যেই মাশরাফি ভাই একসময় বললেন, ‘মুশফিক থাকলে ব্যাটিংয়ে যাইস।’ আমি মনে করলাম উনি ফাজলামো করছেন আমার সঙ্গে। তারপর আরো এক-দুইবার বললেন। তখন চিন্তা করলাম, যদি শেষ ওভারে যেতে হয় এবং আমি স্ট্রাইকে না থাকি, তাহলে তো যেতেই পারি। আমি এক কোনায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। আমার তো কিছু করতে হবে না। কিন্তু তখন শেষ ওভারও অনেক দূরে। আবার আমাদের উইকেটও পড়ে গেছে বেশ কিছু।

প্রশ্ন : প্যাড আপ করেছিলেন কখন?

তামিম : রুবেল ব্যাটিং করার সময়ই আমি প্যাড আপ করে ফেলি। মুস্তাফিজ আউট হওয়ার পর ওই ওভারের (৪৭তম) এক বল বাকি। এবং তখন গিয়ে আমাকেই স্ট্রাইক নিতে হবে। কিন্তু দলের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল অন্য রকম। কথা ছিল মুশফিক স্ট্রাইকে থাকলে আমি যাব এবং গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। ফিজিও বলছিলেন আমি কিছুতেই দৌড়াতে পারব না। এমনকি তিনি মাঠে যাওয়ার অনুমতিও দিচ্ছিলেন না। কিন্তু দিনের শেষে এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারটি ব্যক্তির ওপর এসে যায়। ওই সময়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি আমারই ছিল। ধারণাটা অবশ্য ছিল মাশরাফি ভাইয়েরই। আর উনি যেভাবে আমাকে বলছিলেন, তাতেও আমি উজ্জীবিত হয়েছি অনেকটা। উনি আমাকে তৈরিও করে দিয়েছেন।

প্রশ্ন : এই তৈরি করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটিও একটু বিস্তারিত শুনতে চাই।

তামিম : (হাসি...) গ্লাভস কেটে দিয়েছেন। এমনকি গার্ডও (অ্যাবডমিনাল গার্ড) পরিয়ে দিয়েছেন। আর প্যাড পরিয়ে দিয়েছিল মমিনুল। ক্রিকেট ইতিহাসে মনে হয় আমিই প্রথম ক্রিকেটার, যার গার্ড আরেকজন এসে পরিয়ে দিয়েছে! এটা সম্ভবই না পরানো। কিন্তু সেটিও হয়েছে আমার ক্ষেত্রে। আমার কাছে মনে হয়েছিল, গেলে আমি খেলতে পারব।

প্রশ্ন : ওই সময় কি কেউ নিষেধও করেননি যেতে?

তামিম : করেছেন। কোচ এসেই বলেছেন, ‘তোমার যাওয়ার দরকার নেই। তোমাকে আরো অনেক দিন খেলতে হবে।’ তখন আমি বললাম যে এক বল খেলে নিতে পারব। তখন উনি আবার বললেন, ‘বুঝে নিও কিন্তু। ইটস ইওর কল।’ আমিও বললাম, ‘ঠিক আছে, আমার কল। আমি যাচ্ছি।’ ওই ১৫-২০ সেকেন্ডের মধ্যে আমার মনের মধ্যে যা ঘটছিল, তাতে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর যে বোলারই আসুক না কেন, আমি ওই একটা বল খেলে দিতে পারব।

প্রশ্ন : ওভাবে যাওয়াতে তো ঝুঁকিও ছিল।

তামিম : দেখুন, মাঠে যাওয়ার আগে তো কথা ছিল যে আমি এক বলও খেলব না। এবং দৌড়াবও না। কারণ আমার কবজি মাত্র ভেঙেছে। এই সময়ে হাত নড়াচড়া করা ঠিকও না। কিন্তু মাঠে চলে যাওয়ার পর এত কিছু মাথায় থাকেওনি। ভিডিও দেখলে দেখবেন ওই হাতটা আমি পেছনে রেখে ব্যাটিং করেছি। কিন্তু বলটা যখন ব্যাটে লাগে, তখন ওই হাত একটু সামনেই চলে এসেছিল। যদি বলটা আমি মিস করতাম? ওই জায়গায়ই গিয়ে আবার লাগতে পারত। যদিও ওসব তখন আমার মাথায় নেই। ১৫-২০ সেকেন্ডের জন্য আমার মন অন্য পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। আমি জানি না কেন। খুবই ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। বারবারই এই চিন্তা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল যে সম্ভবত এই এশিয়া কাপে নিজের শেষ বলটা আমি ফেস করতে চলেছি।

প্রশ্ন : ম্যাচ জেতার ছন্দ তো দল ওখান থেকেই ধরেছে?

তামিম : আমি তো নই-ই, আমার মনে হয় না অন্য কেউও এ আশা করেছে যে ওটা হবে ৩২ রানের পার্টনারশিপ। ওই অবস্থায় মুশফিকের কথাও চিন্তা করুন। সে জানে যে ওকে প্রতিটা বলই ফেস করতে হবে। ওই পরিস্থিতিতে বাড়তি ৩২ রানের আশা কেউই করেনি। ভেবেছিলাম আমি যাওয়ার পর যদি ৫-৬ রানও যোগ হয়, জিততে হলে শ্রীলঙ্কাকে ওই বাড়তি রানটা করতে হবে।

প্রশ্ন : আবেগের কথা বলছিলেন। ওই সময় মনের ভেতর আরো অনেক বিষয়ও নিশ্চয়ই কাজ করছিল?

তামিম : আমি ওই অবস্থায়ও দেশের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। এই আবেগটা ছিল। আমি জানি, আমি চার-ছয় মারতে পারব না। না পারব সেঞ্চুরি বা ফিফটি করতে।

প্রশ্ন : মুশফিককেও বারবার কী যেন বলছিলেন?

তামিম : ওকে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। ওকে বলছিলাম, সব বলই মারার দরকার নেই।

প্রশ্ন : আপনি যাওয়ার পর মুশফিক কী বলেছিলেন?

তামিম : (হাসি...) ও বোঝেইনি যে আমি এক হাত দিয়ে ব্যাটিং করছি। কাল (পরশু) রাতেও বলছিল, ‘তুই যে এক হাতে ব্যাটিং করেছিস, এটা আমি বুঝিইনি।’ ও ভেবেছিল যে আমি বোধ হয় ভাঙা কবজি দিয়েই অন্য হাতে সাপোর্ট দিয়ে ওই একটি বল পার করেছি।

প্রশ্ন : শ্রীলঙ্কা দল তো বোধ হয় হতভম্বই হয়ে গিয়েছিল?

তামিম : আমাদের বাংলাদেশের বিপক্ষে কোনো দল যদি ওই অবস্থা থেকে ২২৯ থেকে ২৬১ করে ফেলত, তাহলে আমরা হতভম্ব হয়ে যেতাম।

প্রশ্ন : ভাঙা কবজি নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমে যাওয়ার আগে কি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্য কোনো এ রকম বীরোচিত ব্যাপার মাথায় ছিল?

তামিম : এখন যেভাবে মানুষ প্রশংসা করছে অথবা মানুষ এটা নিয়ে দুটো কথা বলছে, এসব আমার মাথায় কিছুই ছিল না। এটা পরিকল্পিত কিছু নয়। নাম হবে বলে তো ওই সময়ে ব্যাটিংয়ে নামিনি। বিষয়টি আমার হৃদয় থেকে এসেছে। আমি শুধু দেশের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। সেটা যদি এক বলের জন্যও হয়, তাও। আমি তখন অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম।

‘মনে হচ্ছিল তামিমের জন্য কিছু করি’



মন্তব্য