kalerkantho


রূপগঞ্জে গুলিবিদ্ধ তিন লাশ

ডিবি পরিচয় দেওয়া খুনি কারা?

এস এম আজাদ   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ডিবি পরিচয় দেওয়া খুনি কারা?

রাজধানীর উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পূর্বাচল উপশহর থেকে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ এখনো অন্ধকারে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়ার পর তাঁদের লাশ পাওয়া যায়। গতকাল শনিবার পর্যন্ত তিনজনকে কারা ও কেন খুন করেছে সে রহস্যের কিনারা করতে পারেনি পুলিশ।

ডিবি পরিচয়ে যারা তিনজনকে বাস থেকে তুলে নিয়ে গেছে তাদেরই সন্দেহ করছেন তাঁদের স্বজনরা। আর কাউকে সন্দেহ করছেন কি না সেটা বলছেন না তাঁরা। এমনকি নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ হত্যা মামলা করতে রাজি হননি। এ কারণে পুলিশ বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ সিকান্দার আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো ক্লু নেই। আমরা কিছুই পাইনি। খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’

গত শুক্রবার সকালে পূর্বাচল উপশহরের আলমপুর এলাকার ৯ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সেতুর নিচ থেকে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁরা হলেন মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর মৃত আব্দুল ওহাবের ছেলে নূর হোসেন বাবু (২৯), তাঁর ভায়রা ভাই ঝিনাইদহের গুড়েলা এলাকার আব্দুল মান্নানের ছেলে শিমুল আজাদ (২৭) এবং তাঁদের বন্ধু রাজধানীর বনানী থানাধীন মহাখালী দক্ষিণপাড়ার মৃত শহিদুল্লাহর ছেলে সোহাগ ভূঁইয়া (৩৩)। সোহাগ মহাখালীতে ডিশ কেবল নেটওয়ার্কের ব্যবসা করতেন। আবার তিনজন মিলে মাণ্ডায় ঝুট ব্যবসা করছিলেন।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিহত শিমুল আজাদ ছিলেন রাজধানীর মহাখালীর একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিবুর রহমান সুমন ওরফে ব্যাংকক সুমনের অন্যতম সহযোগী। ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন সুমন। এরপর মহাখালী সাততলা বস্তি এলাকা থেকে শিমুল পরিবার নিয়ে মুগদার মাণ্ডা এলাকায় চলে যান। মহাখালীর দক্ষিণ পাড়ায় নিজেদের বাড়ি ও ডিশ ব্যবসা থাকলেও সোহাগ ভূঁইয়াও থাকতেন মাণ্ডা এলাকায়। সাততলা বস্তি এলাকার বাসিন্দা ছিলেন নূর হোসেন বাবুও। তাঁরা তিনজন মাণ্ডায় গিয়ে ঝুট ব্যবসা শুরু করছিলেন। গত বছরের ঈদুল ফিতরের দিন মহাখালীর দক্ষিণ পাড়ায় ডিশ ব্যবসার লাইনম্যান শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে সোহাগ ও শিমুলের বিরুদ্ধে। ওই হত্যা মামলায় দুজনই পলাতক আসামি। শফিক হত্যা মামলা ছাড়াও বনানী থানায় শিমুলের বিরুদ্ধে আরো আটটি এবং সোহাগের বিরুদ্ধে আরো চারটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ বা সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা এলাকাবাসীর।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রগুলো বলছে, খুনিদের টার্গেট ছিলেন শিমুল ও সোহাগ। তাঁদের সহযোগী হওয়ায় বাবুকেও হত্যা করা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ব্যাংকক সুমন সন্ত্রাসী মুকুল ও আক্তারের হাত ধরে ‘বাহিনী’ গড়ে তুলেছিলেন। খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে ওই ‘বাহিনী’ গুলশান, নিকেতন, বনানী, মহাখালী ও বাড্ডা এলাকায় ত্রাস ছড়ায়। তারা কথায় কথায় লোকজনকে গুলি করত। শিমুল আগে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী সুমনের সহযোগী ছিলেন। থাকতেন সাততলা বস্তি এলাকায়। সুমন নিহত হওয়ার পর আড়ালে চলে যান শিমুল। সে কারণে তিন খুনের ঘটনায় শিমুলই প্রধান টার্গেট ছিলেন বলে একটি সূত্র জানায়। খুব কাছে থেকে শিমুলের বুকে পাঁচটি গুলি করা হয়। আর বাকিদের শরীরে গুলির সংখ্যা কম।

স্বজনরা সন্দেহ করছেন, অস্ত্র চালনায় পারদর্শী কোনো গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত।

রূপগঞ্জ থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না করায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছে। পরস্পর যোগসাজশে হত্যা করে গুম করার অপরাধে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে করা মামলাটির বাদী রূপগঞ্জ থানার এসআই সফিউদ্দিন। পরিবারের পক্ষ থেকে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়নি। তবে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে বলে জানান ওসি।

শুক্রবার নিহতদের লাশ শনাক্ত করে স্বজনরা দাবি করেছিলেন, ঝিনাইদহে শিমুলের গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার পথে বৃহস্পতিবার ভোরে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বাস থেকে তিনজনকে তুলে নিয়ে যায় ডিবি পরিচয় দেওয়া একদল লোক। এরপর শুক্রবার তাঁরা রূপগঞ্জ থানায় এসে তাঁদের লাশ পান।

গতকাল জানতে চাইলে বাবুর স্ত্রী মুক্তা বলেন, ‘শিমুলের কোনো ঘটনার জেরে এই খুন হয়েছে। আমরা আর কিছু জানি না। শুনেছি ডিবি নিয়ে গেছে।’

শিমুলের ছোট ভাই শাহ আলম বলেন, ‘ঢাকা-যশোর রোডের পূর্বাশা পরিবহনের বাস থেকে ডিবি পরিচয়ে তাঁদের আটক করা হয়। বাসের লোকজন আমাদের বলেছে। এর বেশি কিছু জানি না।’ মামলা না করার ব্যাপারে তাঁর জানা নেই বলে দাবি করেন শাহ আলম।

শিমুলের স্ত্রী আয়শা আক্তার নিপার কাছে মামলা না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।

মহাখালীর দক্ষিণপাড়ায় গিয়ে জানা গেছে, ১০৬/২ নম্বর বাড়িটি সোহাগদের পৈতৃক বাড়ি। তাঁর স্ত্রী ও ১১ বছরের একটি ছেলে আছে। আগে মহাখালী ও সাততলা বস্তি এলাকার বড় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সোহাগ। তবে তাঁর ভাই শরীফ বলেন, ‘কোনো ঝামেলা থাকলে সেটা শিমুলের। আমার ভাইয়ের না।’

বনানী থানার ওসি বি এম ফরমান আলী কালের কণ্ঠকে জানান, গত বছরের ২৬ জুন ঈদুল ফিতরের দিন শফিকুল ইসলাম (২৫) নামে এক ডিস লাইনম্যানকে মহাখালী এলাকায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই মামলার আসামি সোহাগ ও শিমুল। ডিশ ব্যবসা নিয়ে বিরোধে শফিক খুন হন।

ওসি জানান, শিমুলের বিরুদ্ধে বনানী থানায় শফিক হত্যা মামলা ছাড়াও অস্ত্র ও মাদকের আরো আটটি মামলা আছে। অন্যদিকে সোহাগের বিরুদ্ধেও মাদকের আরো চারটি মামলা রয়েছে।



মন্তব্য