kalerkantho


তামিমের বীরত্ব, মুশফিকের বিস্ফোরণ

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তামিমের বীরত্ব, মুশফিকের বিস্ফোরণ

মুশফিকুর রহিমের অসাধারণ সেঞ্চুরিতে জয়ের শুরু বাংলাদেশের এশিয়া কাপ। ছবি : এএফপি

বাংলাদেশ : ৪৯.৩ ওভারে ২৬১, শ্রীলঙ্কা : ৩৫.২ ওভারে ১২৪, ফল : বাংলাদেশ ১৩৭ রানে জয়ী

শুরুতেই সাজানো বাগান তছনছ। একটু পরেই দেখা গেল সেই বাগানের প্রধান মালিও নেই। তা-ও আবার তাঁর না থাকাটা অপঘাতে।

অপঘাতেই তো। ডান হাতের ফুলে থাকা আঙুলের ব্যথা নিয়ে নামা তামিম ইকবালের বাঁ হাতের কবজিও যে আক্রান্ত, সুরঙ্গা লাকমলের বাউন্সারে হুক করতে গিয়ে। তা নিয়ে সবিস্তারে যাওয়ার আগে আরেকটি কথাও বলে রাখা দরকার। কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওয়ানডে সিরিজজয়ী দলটি সাজানো বাগানই হয়ে উঠেছিল। আর সেই বাগানের প্রধান মালি তিন ম্যাচে অপরাজিত ১৩০, ৫৪ ও ১০৩ রানের ইনিংস খেলা তামিম ছাড়া আর কে!

সেই তিনি ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারের শেষ বলে বেরিয়ে গিয়ে ছুটলেন হাসপাতালে। কিন্তু দিনের শেষে হোটেলে ফিরলেন ১৩৭ রানের বিশাল জয় ঝলমলে চেহারায়। পুরো দলকে সেই চেহারায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বীরত্বগাথাও তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিরকালীন ইতিহাসে গ্রন্থিত হয়ে থাকবে।

কারণ তিনি হাসপাতাল থেকে ফিরেছিলেন তবে কবজিতে চিড় ধরার দুঃসংবাদ নিয়ে। স্লিংয়ে হাত ঝুলিয়ে বিষণ্ন চেহারায় বসেও থাকতে দেখা গেল তাঁকে। ততক্ষণে প্রথম ওভারেই লাসিথ মালিঙ্গার বলে ওপেনার লিটন কুমার দাশ এবং ইদানীং তিনে দারুণ সফল সাকিব আল হাসানের পর পর দুই ডেলিভারিতে বিদায়ের ধাক্কা তরুণ মোহাম্মদ মিঠুনকে নিয়ে অনেকটা সামলে নিয়েও শেষ পর্যন্ত মুশফিকুর রহিম নিঃসঙ্গ।

নিজের ষষ্ঠ ওয়ানডে সেঞ্চুরিও করে ফেলেছেন ততক্ষণে, কিন্তু আবার নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় দলকে আরো এগিয়ে দেওয়ারও উপায় নেই। কারণ তামিম নামতেই পারবেন না বলে সবার জানা। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কবজিতে ব্যান্ডেজ বেঁধে আসা তামিম নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে মুস্তাফিজুর রহমান আউট হওয়ার পরেই সবাইকে চমকে দিয়ে নেমে গেলেন মুশফিককে সঙ্গ দিতে।

সঙ্গ পাওয়া মুশফিকও যেন উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাসে মারদাঙ্গা হলেন আরো। তামিম নেমে শুধু একটি বলই খেললেন। তা-ও এক হাতে। খুব খেয়াল করে দেখা গেল, বাঁ হাতের গ্লাভস কেটে বের করে রাখা আছে সব আঙুলই। ওই অবস্থায়ই ৪৭তম ওভারের শেষ বলটি এক হাতে সামলে দিলেন তামিম। পরের ওভার থেকেই যেন জেতার ছন্দটা ধরে দিতে শুরু করলেন মুশফিক। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ জিতে যে ছন্দ ধরার কথা গত বেশ কয়েক দিন ধরেই বলে আসছিল বাংলাদেশ শিবির। তামিম নামার পর ১৫ বল খেলে মুশফিক তিনটি করে ছক্কা আর বাউন্ডারিতে তুলে দিলেন আরো ৩২ রান। তাতে মুশফিকের ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ইনিংস ১৪৪ পর্যন্ত যেমন পৌঁছল, তেমনি শ্রীলঙ্কার লক্ষ্য ২৩০ রানের না হয়ে হলো ২৬২ রানের।

তামিমকে নামতে দেখে লঙ্কানরা যেমন ভড়কে গেল, তেমনি বাংলাদেশ শিবির যেন বিশাল সংগ্রহে পেয়ে গেল প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার আত্মবিশ্বাসও। তাতে রান তাড়ায় নামা অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের দলকে এমনভাবে চেপে ধরা হলো যে টপাটপ উইকেট পড়তে থাকল। অন্য দিন যা ঠিক হয় না, এদিন তা-ও ঠিকঠাক। ঠিক সময়ে রিভিউ নেওয়ার সাফল্যে মুস্তাফিজুর রহমানের বলে কুশল মেন্ডিসের বিদায়ে শুরু হওয়া ধস আর থামেই না।

ওয়েস্ট ইন্ডিজে বল হাতে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাও রাখেন দারুণ ভূমিকা। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে দারুণ মিতব্যয়ী মেহেদী হাসান মিরাজও কম যান না। তাই শিরোপা জেতার লক্ষ্য নিয়ে আসা বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ জিতে ‘মোমেন্টাম’ বা ছন্দ ধরে ফেলাটা হয়ে যায় শুধুই সময়ের ব্যাপার। আর সেই ছন্দোময় জয়ে ‘একহাতি’ তামিম বীরত্বের ছোঁয়াই যেন সবচেয়ে বেশি লেগে থাকল।

তামিমের নেমে পড়াই কাজ করল ‘টনিক’ হিসেবে। তাতে মুশফিক উজ্জীবিত হলেন সবার আগে। তাঁর ব্যাটে বড় পুঁজি নিশ্চিত হওয়ার পর বোলারদের আর পায় কে! তাঁরা হয়ে ওঠেন দুরন্ত এবং দুর্বার। মুস্তাফিজ ব্রেক থ্রু দেওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজে ৭ উইকেট নিয়ে দলের সেরা বোলার মাশরাফি পর পর দুই ওভারে তুলে নেন উপুল থারাঙ্গা ও ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে। ৩২ রানেই ৩ উইকেট খুইয়ে ধুঁকতে থাকা শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ে তবু এখান থেকেও ঘুরে দাঁড়ানোর মতো ব্যাটসম্যানের মজুদ ছিল।

কিন্তু সেটাও লুট করেন উইকেট তেমন না পেলেও ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে রান খরচে দারুণ কৃপণ মেহেদী হাসান মিরাজ। দুই বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান কুশল পেরেরা ও থিসারা পেরেরা যে শিকার এই অফস্পিনারেরই। এর আগেই ম্যাচে নিজের প্রথম বলে লড়াকু লঙ্কান অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজকেও এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেছেন রুবেল হোসেন। এরপর মিরাজের বলে যখন গেলেন থিসারাও, স্কোর বোর্ডে তখন লঙ্কানদের অবস্থা ৭ উইকেটে ৬৯!

জয় তখন লঙ্কানদের থেকে যত দূরের, বাংলাদেশের ততই কাছের। শেষ পর্যন্ত বোধ হয় এই উপসংহারে পৌঁছানো যাচ্ছে যে অপঘাতে বেরিয়ে যাওয়া তামিমের ফেরাই শ্রীলঙ্কার জন্য প্রাণঘাতী হয়ে গেল।



মন্তব্য