kalerkantho


অগ্রযাত্রার ১০ বছর

পাটে সোনালি দিনের হাতছানি

শওকত আলী   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পাটে সোনালি দিনের হাতছানি

পাটের হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিন পুনরুদ্ধারে শুরু হয়েছিল বিস্তর গবেষণা। সেই গবেষণার মূলে ছিল কী করে পণ্যটির বহুল ব্যবহার ঘটানো যায়। এর পরই পাট থেকে তৈরি হতে থাকে নানা পণ্য। পাট থেকে তৈরি পণ্যের সংখ্যা এখন গিয়ে ঠেকেছে ২৩৭-এ। যে কারণে দেশে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানিও প্রতিনিয়তই বাড়ছে।

পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়া, দড়ি, কার্পেট, বস্তা ছাড়া আর কোনো পণ্য না থাকা—একসময় পাট খাতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কৃষক পাট চাষ কমিয়ে দিয়েছিল। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পাটকলগুলো আবার চালু করার। সেগুলো চালুও করা হয়। পাটপণ্য বাধ্যতামূলক করতে ‘ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট’ প্রণয়ন, জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেপিডিসি) ও পাটনীতি তৈরি করাসহ নানা কার্যক্রম শুরু হয়। এর সঙ্গে চলতে থাকে গবেষণা। দড়ি, কার্পেট ও বস্তা ব্যবহারের পাশাপাশি এখন প্রাকৃতিক এই তন্তু ফ্যাশন ও বিলাস পণ্যের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে। এসব পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাটের তৈরি ব্যগ, যা কিনা পাটজাত মোট পণ্যের ৮০ শতাংশ দখল করে আছে। এর মধ্যে বাজার করার ব্যাগ যেমন রয়েছে, নারী-পুরুষের ব্যবহারের ফ্যাশনেবল ব্যাগও রয়েছে। এরপর নানা ধরনের হোম ডেকোরেশনের পণ্য যেমন—পাপোশের মতো জিনিসগুলো তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের জুতা, স্যান্ডেলও তৈরি হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশি এক বিজ্ঞানীর একটি নতুন পাটপণ্যের আবিষ্কার দেশ-বিদেশে সাড়া ফেলে দিয়েছে—পাটের আঁশ দিয়ে পলিথিন ব্যাগ তৈরি। দেশের পরিবেশের জন্য হুমকি যে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, সেটা এই পাটের পলিব্যাগের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান পাট থেকে এই পলিথিন আবিষ্কার করেন; যার নাম দেওয়া হয়েছে সোনালি ব্যাগ। পাট থেকে তৈরি হচ্ছে ভিসকস, পাটপাতার চা। কম্পোজিট জুট জিও টেক্সটাইলসহ নানা বিষয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এ খাতকে আবার চাঙ্গা করতে শুরু করেছে।

শুধু দেশের বাজারেই নয়, নানা পণ্যের চাহিদা রয়েছে দেশের বাইরেও। প্রতিনিয়তই বাড়ছে এই পণ্যের চাহিদা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পাট খাতের রপ্তানি আয় ছিল ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা বেড়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দ্বিগুণ হয়। চলতি বছর এ পর্যন্ত রপ্তানির পরিমাণ ৯১ কোটি ৯৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫৪ কোটি ২২ লাখ ডলার। কাজ চলছে রপ্তানি পণ্যের নতুন নতুন বাজার তৈরি করতেও। এরই মধ্যে আফ্রিকার দেশ সুদানে হারানো বাজার পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ঘানা, কেনিয়া ও ক্যামেরুনের বাজারে দেশের পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া চীন, দুবাই ও কাতারের বাজারে পাটপণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে। নতুন নতুন বাজার তৈরিতে দেশের বাইরে বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এ বছরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চীনে একটি মেলায় তাদের পণ্যের প্রদর্শনী করবে। পণ্যের বহুমুখীকরণই পাট খাতের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জেডিপিসি) পরিচালক (পিএমআই) মো. মইনুল হক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন প্রায় ২৫০টির মতো পণ্য রয়েছে, যেগুলো পাট থেকে তৈরি। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৩৭টি ঘোষণা করা হয়েছে। এই পণ্যগুলোই এখন খাতটিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রচুর পণ্য থাকলেও দেশি বাজারটি এখনো সেভাবে উন্নত হয়নি। পণ্যগুলোর অনেকটাই আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী করা হচ্ছে। তবে শিল্পোদ্যোক্তারা অনেকে এখন আধুনিক মেশিনারিজ নিয়ে এ সেক্টরে আসতে শুরু করেছেন। যেটা এই খাতের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।’

জানা গেছে, ২০০১-০২ সালের দিকে যখন পাটের খুবই দুরবস্থা, কৃষক প্রচুর পরিমাণে চাষ করছে কিন্তু বাজারে দাম পাচ্ছে না, তখন নতুন করে ভাবনা জুগিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরামর্শ ও সহযোগিতায় দড়ি, চট, বস্তার পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্য তৈরির কাজ শুরু হয়। সে সময় তারা অর্থায়নও করেছে, যা থেকে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ১০০ টাকা করেও দেওয়া হয়েছে। তবে এখন এই প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য মানুষকে প্রায় তিন-চার মাস আগে থেকেই অপেক্ষমাণ থাকতে হয়। নিজেরাই টাকা খরচ করে এই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। মূল পরিবর্তনটা ২০১০ সালের পর থেকেই শুরু হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে তৈরি পোশাক খাতের মতো একটা পর্যায়ে যেতে আরো সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তারা।

ওই কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন, পাটকলগুলো নতুন করে চালু হওয়াও এই পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। পাটকলগুলোর মধ্যে বন্ধ থাকা খালিশপুর জুটমিলস, দৌলতপুর জুটমিলস, জাতীয় জুটমিলস, কর্ণফুলী জুটমিলস ও ফোরাত কর্ণফুলী কার্পেট মিলস আবার চালু করার মধ্য দিয়ে নতুন করে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

এসবের বাইরে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনকেও এ খাতের জন্য এক বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে একদল গবেষক দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছেন। ২০১২ সালে পাটের জন্য ক্ষতিকর এক ধরনের ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন করায় উন্নত পাটের জাত উদ্ভাবনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যান তাঁরা। দেশি পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কৃত হওয়ায় সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া পাটের দুটি জাতের জীবনরহস্য এখন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের হাতে। এগুলোর স্বত্ব পেলে বিশ্বের যেকোনো স্থানে পাট নিয়ে গবেষণা হলে বাংলাদেশ অর্থ পাবে।



মন্তব্য