kalerkantho


অগ্রযাত্রার ১০ বছর

বিদ্যুতে আশার আলো

উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে চার গুণ
গ্রাহক বেড়ে হয়েছে তিন গুণ

আরিফুর রহমান   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিদ্যুতে আশার আলো

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়নের কাঁঠালী গ্রামে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয় গত জুনে। এর আগে গ্রামে রাতে আঁধার দূর করার জন্য ছিল সৌরবিদ্যুৎ। রাতেরবেলা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, মোবাইল ফোনসেট চার্জ দেওয়া, টেলিভিশন দেখা সব কিছুই ছিল সৌরবিদ্যুিনর্ভর। সদর উপজেলার দিঘলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ বছর মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া রিমু আক্তার পল্লী বিদ্যুতের আলোয় এখন পড়াশোনা করতে পেরে বেজায় খুশি।

কাঁঠালী গ্রামটির মতো দেশের অন্য জেলার গ্রামগুলোতেও প্রতিদিন কোনো না কোনো পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে বিদ্যুৎ সুবিধা।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আগামী বছরের মধ্যেই দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন থেকে ১০ বছর আগে দেশে বিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা ছিল এক কোটি আট লাখ। সেটি এখন বেড়ে তিন কোটিতে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে বিদ্যুতের গ্রাহক বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। ১০ বছর আগে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল চার হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট। তা বেড়ে হয়েছে ১৮ হাজার ৯০২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে হয়েছে চার গুণ। আর বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন আগে যেখানে ছিল তিন হাজার মেগাওয়াট, তা এখন ১১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটের ঘরে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, শুধু বিদ্যুৎ সঞ্চালনে নয়; বিতরণেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে এক কর্মকর্তা জানালেন, ২০১০ সালে সারা দেশে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার। সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার কিলোমিটারে। আর বিতরণ লাইন ১০ বছর আগে ছিল এক লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার। সেটি এখন বেড়ে চার লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের সিস্টেম লস নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। তবে গত প্রায় ১০ বছরে বিদ্যুতের সিস্টেম লস ৫ শতাংশের মতো কমেছে। ২০১০ সালে সিস্টেম লস ছিল ১৭ শতাংশ। সেটি এখন কমে ১২ শতাংশ হয়েছে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুতে ৫ শতাংশ সিস্টেম লস কমানোর কারণে আমাদের ছয় হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। আমরা সিস্টেম লস কমাতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এটি আরো কমে আসবে।’

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে ৭ শতাংশের ওপরে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিদ্যুতের অবদান তার ৫ শতাংশ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির হেরে যাওয়ার পেছনে অন্য অনেক ইস্যুর চেয়ে বিদ্যুৎ ইস্যুটি বেশি দায়ী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক জরিপেও উঠে এসেছে, দেশের জাতীয় নির্বাচনে বিদ্যুৎ কতটা প্রভাবক ভূমিকা রাখে। বিবিএসের জরিপ বলছে, দেশের ৬৪ শতাংশ মানুষের অভিমত, জাতীয় নির্বাচনে বিদ্যুৎ বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে। বিদ্যুতের জন্য বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট কি না—এ প্রশ্নের জবাবে ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা তাদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বলেছে, তাদের বাসা বা বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছেছে। শহরের পাশাপাশি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারাও এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একসময় ঢাকায় গড়ে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। ২০০৯ সালে আমরা প্রথম মেয়াদে যখন ক্ষমতা গ্রহণ করি, তার আগে পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যেত, বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং মানুষের ভোগান্তি নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কৃষক সেচ দিতে পারেনি। কত স্থানে বিদ্যুৎ বিভাগের অফিস ঘেরাও হয়েছে; তার কোনো হিসাব নেই। এই সংকটের মাঝে আমাদের সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল যেভাবে হোক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং আমরা সেটি করেছি।’

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সালের মধ্যে সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে সরকার। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি (২০১৫-২০৩০) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়ন হচ্ছে। পাশাপাশি ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করারও স্বপ্ন দেখছে সরকার। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে দরকার বিদ্যুৎ সুবিধা এবং তা হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন। শিল্প-কারখানাসহ প্রতিটি ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে সারা দেশে এখন প্রায় শতাধিক প্রকল্প চলমান বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সারা দেশে এখন শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর পায়রাতে ১০ হাজার মেগাওয়াট এবং কক্সবাজারের মহেষখালীতে ১০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান। তিনি বলেন, ‘আমরা ২০২১ সালের মধ্যে দেশে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।’ এ ছাড়া ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দেশে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে জানান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন।

বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার সারা দেশে যেসব বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে খরচ হবে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এআইআইবি, রাশিয়া, চীন ও জাপানের কাছ থেকে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার। পাশের দেশ ভারত থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। শুধু সঞ্চালনেই নয়; বিতরণেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুতে শুধু সরকারের একার পক্ষে এত বিশাল বিনিয়োগে হবে না। এখানে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্য বেসরকারি খাত এগিয়েও আসছে। যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা আবারও সরকার গঠন করতে পারি তাহলে বিদ্যুৎ খাতের বিশাল বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একটি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহারের দেশে পরিণত হতে পারব।’



মন্তব্য