kalerkantho


মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ৫৫০০ কোটি টাকা লোপাট!

১০ সদস্যের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক

হায়দার আলী   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ৫৫০০ কোটি টাকা লোপাট!

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ১০ সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে সরকার নির্ধারিত টাকার বাইরে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাড়তি সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এমন একটি অভিযোগ এবং গণ্যমাধ্যমে উঠে আসা বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদ যাচাই-বাছাই শেষে কমিশন আমলে নিয়ে অভিযোগটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনুসন্ধানের জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক মো. শফিউল্লাহকে প্রধান করে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

দেশে সরকারের নিবন্ধিত প্রায় এক হাজারের মতো রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। এসব রিক্রুটিং এজেন্সির সংগঠন হচ্ছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)। অভিযোগ উঠেছে, বিশালসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে বাদ দিয়েই ১০টি  এজেন্সি একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাত। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে গড়া একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সরকারিভাবে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নিয়ম থাকলেও ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকায় কর্মী পাঠায়। এভাবে কর্মীপ্রতি আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ১০ সিন্ডিকেট। এভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে জনশক্তি নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়ার সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সভাপতিত্বে ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক বিশেষ কমিটির বৈঠকে কর্মী নিয়োগের বিশেষায়িত পদ্ধতি এসপিপিএ (যা জিটুপি প্লাস নামে পরিচিত) থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হঠাৎ করে মালয়েশীয় সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ হলেও বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জিটুজি পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে জিটুজি প্লাস (সরকারি-বেসরকারি) সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া হয় অনলাইনে। এর এক বছর পর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া গেছে প্রায় দুই লাখ কর্মী।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের সদস্য ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড, ক্যারিয়ার ওভারসিজ, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল, এইচএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স, সানজারি ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম ও আল ইসলাম ওভারসিজ। প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটসের মালিক আরিফ আলম। তিনি এক মন্ত্রীর শ্যালক। ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক বায়রার সদ্য সাবেক মহাসচিব মো. রুহুল আমিন স্বপন। রাব্বী ইন্টারন্যাশনালের মালিক বায়রার সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোহাম্মদ বশির। প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজমের মালিক বায়রার সাবেক সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা। এর সঙ্গে যুক্ত আছেন ছাত্রলীগের একজন সাবেক সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের একজন নেতা। সানজারি ইন্টারন্যাশনালের মালিক শেখ আবদুল্লাহ।

ক্যারিয়ার ওভারসিজের মালিক রুহুল আমিন, বদরুল আমিনসহ তাঁরা তিন ভাই। আল ইসলাম ওভারসিজের মালিক জয়নাল আবেদীন জাফর। তিনি পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের পরিচালক। আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের পরিচালক তুহিন সিদ্দিকী। আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক মো. রুহুল আমিন।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হলেও মালয়েশিয়া সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকসহ সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে আঁতাত করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান দাতুক শ্রী আমিন বিন আব্দুন নূর পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সে দেশের রাজনীতিবিদ, সাবেক আমলাসহ প্রভাবশালীদের নিয়ে সিনারফ্ল্যাক্স নামে একটি কম্পানি তৈরি করে বাংলাদেশ থেকে অনলাইনে কর্মী নেওয়া হতো।



মন্তব্য