kalerkantho


আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের পর্যবেক্ষণ

রোহিঙ্গা ফেরত না নেওয়ার অপরাধও মানবতাবিরোধী

♦ মিয়ানমারের অপরাধের প্রমাণ হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করার তাগিদ
♦ স্বাগত জানিয়েছেন আসিয়ান পার্লামেন্ট সদস্যরা

মেহেদী হাসান   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা ফেরত না নেওয়ার অপরাধও মানবতাবিরোধী

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরিয়ে না নিলে বা ফিরতে বাধা দিলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি)। গত বৃহস্পতিবার রাতে নেদারল্যান্ডসের হেগে আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১-এর ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষণ অংশে এ অভিমত স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শিকার হওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইসিসি রায়ে বলেছেন, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও বিতাড়িত করে ঠেলে পাঠানোসহ অন্যান্য অভিযোগ তদন্ত করতে পারবেন আইসিসি। ওই রায়ে আইসিসির প্রসিকিউটরকে (কৌঁসুলি) যৌক্তিক সময়ের মধ্যে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইসিসির ওই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর পার্লামেন্ট সদস্যরা। আসিয়ান পার্লামেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য দিয়েছে। এপিএইচআর সভাপতি ও মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো বিবৃতিতে বলেছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংসতার অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এটি একটি অগ্রগতি ও মাইলফলক সিদ্ধান্ত।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাসে আইসিসিতে বিচারিক এখতিয়ার সম্পর্কে ইতিবাচক অভিমত জানানোর সময়ই বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ওই আদালতকে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। আইসিসির কৌঁসুলিকেও তাঁর তদন্তকাজে বাংলাদেশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

৫০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় ঘেঁটে জানা যায়, প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদাকে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের মানবতাবিরোধী অপরাধসহ আইসিসির রোম সংবিধিতে বর্ণিত অন্য অপরাধগুলোও তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১। আদালত রায়ে বলেছেন, মিয়ানমার আইসিসির রোম সংবিধির পক্ষ না হলেও রোহিঙ্গাদের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও বিতাড়নের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তাদের বাংলাদেশে আসার মাধ্যমে। বাংলাদেশ আইসিসির রোম সংবিধির পক্ষ বা আইসিসির সদস্য হওয়ায় ওই অপরাধের বিচারিক এখতিয়ার আইসিসির আছে।

রায়ের ৭৭তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইসিসির রোম সংবিধি অনুযায়ী কারো জন্য উদ্দেশ্যমূলক দুর্ভোগ সৃষ্টি বা শারীরিক কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি করলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা বাংলাদেশে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের ফেরার ক্ষেত্রে বাধা দেবে বলেও ধারণা করা হয়। মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ফিরতে বাধা দিচ্ছে বলে প্রমাণিত হলে তা আইসিসি সংবিধি অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আদালত বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কাউকে তার নিজ দেশে ফেরা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের অর্থ হলো আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। তা ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে তার নিজ দেশে ফিরতে বাধা দেওয়ার ফলে ব্যাপক দুর্ভোগ বা শারীরিক কিংবা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। একটি দল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের বাড়িঘর থেকে উৎখাত করে দেশ ছাড়া করার ফলে তাদের যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ আরো তীব্র হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তারা শোচনীয় অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়।

আদালত তাঁর প্রসিকিউটরকে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি এর গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে ‘ভারনাভা ও অন্যান্য বনাম তুরস্ক’ মামলার রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বলেছেন, দেরি না করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া উচিত এবং কার্যকর বিচারের জন্য দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত করা উচিত। কারণ সময়ক্ষেপণ হলে সাক্ষীদের স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে যেতে পারে। সাক্ষীরা মারা যেতে পারে বা তাদের খোঁজ নাও মিলতে পারে। কিংবা তথ্য-প্রমাণ হারিয়ে যেতে পারে। ফলে কার্যকর তদন্তের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।

আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১ তাঁর পর্যবেক্ষণের শেষ অংশে বলেছেন, আইসিসির রোম সংবিধির ৭৫তম অনুচ্ছেদেও বলা আছে যে প্রতিকার প্রক্রিয়া অন্তর্নিহিতভাবে ফৌজদারি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তদন্ত শুরু করতে দেরি করার অর্থ হলো আদালতের এখতিয়ারাধীন অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পেতে বিলম্ব হওয়া।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও বিতাড়িত করার অভিযোগ প্রসঙ্গে আইসিসি তাঁর বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন কি না, তা জানতে চেয়ে গত ৯ এপ্রিল আদালতে আবেদন করেছিলেন আইসিসির প্রসিকিউটর। এরপর ১১ এপ্রিল প্রি-ট্রায়াল ডিভিশনের প্রেসিডেন্ট ওই আবেদন বিবেচনার জন্য চেম্বার আদালতকে অনুরোধ জানান। ওই আদালতের অনুরোধে বাংলাদেশ গত ১১ জুন আদালতে ‘গোপনীয়’ আকারে পর্যবেক্ষণ জমা দেয়। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ আইসিসিকে জানিয়েছেন, এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর আইসিসির পূর্ণ এখতিয়ার আছে।

বেশ কয়েকজন অ্যামিকাস কিউরিও তাঁদের পর্যবেক্ষণ জমা দেন আদালতে। গত ২০ জুন প্রসিকিউটরকে নিয়ে বিচারকদের রুদ্ধদ্বার স্ট্যাটাস কনফারেন্স (শুনানি) শেষে প্রসিকিউটরের আবেদনের বিষয়ে মিয়ানমারেরও পর্যবেক্ষণ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে গণবিজ্ঞপ্তি দেয়।

আদালত মিয়ানমারের ওই গণবিজ্ঞপ্তিকে আমলে নেওয়ার পাশাপাশি সব পক্ষের যুক্তি বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধ তদন্তের এখতিয়ার আছে বলে সিদ্ধান্ত দেন।

আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১ তাঁর রায়ে বলেছেন, আদালতের অনুরোধে বাংলাদেশ তার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছে। তাই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা ছিল সীমিত। আদালত বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী যেকোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল তাঁর নিজের বিচারিক এখতিয়ার সীমা নির্ধারণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফরাসি ‘লা কম্পিটেন্স ডি লা কম্পিটেন্স’ বা জার্মান ‘কম্পিটেঞ্জ-কম্পিটেঞ্জ’ নীতি অনেক আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনালে স্বীকৃত। ১৯৫৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসও (আইসিজে) বলেছেন, কোনো চুক্তি না থাকলে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নিজেই তাঁর বিচারিক এখতিয়ার নির্ধারণ করতে পারেন।

ইন্টার আমেরিকান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটস, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আপিল কর্তৃপক্ষসহ অনেক বিচারিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের এখতিয়ার নির্ধারণ করেছে। সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ট্রাইব্যুনাল এবং লেবাননের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালও এই নীতি অনুসরণ করেছেন।

আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, রোম সংবিধির পক্ষ না হওয়ায় মিয়ানমার তার ওপর আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার নেই বলে দাবি করেছে। মিয়ানমার তার অবস্থান বদলাবে বলে আইসিসি আশা করছেন।

আইসিসির সদস্য নয় এমন রাষ্ট্রগুলোকে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকির মতো গুরুতর অপরাধের বিচারের আওতায় আনতে জাতিসংঘ সনদের আওতায় উদ্যোগ নেয় নিরাপত্তা পরিষদ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো অনেক দেশ আইসিসির সদস্য না হলেও এর গুরুত্ব স্বীকার করে।

আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১ তাঁর পর্যবেক্ষণে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি’ ও ‘বহিষ্কার’কে আলাদা দুটি অপরাধ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

অ্যামনেস্টি বলেছে—রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের পথ খুলল : যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, রোহিঙ্গাদের তাদের বাড়িঘর থেকে তাড়ানো হয়েছে। সেনারা প্রায়ই তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে এবং আগুন দিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। এসব অপরাধের বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে আইসিসির ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট পথ সৃষ্টি করবে।

অ্যামনেস্টির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক বিরাজ পাটনায়েক গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ভয়ংকর জাতিগত নির্মূল অভিযানে সাত লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। আইসিসির সিদ্ধান্ত সঠিক গন্তব্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

আইসিসির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান মিয়ানমারের : বিচারিক এখতিয়ার বিষয়ে আইসিসির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার সরকার। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইসিসির সিদ্ধান্তে মিয়ানমার সরকার দুঃখিত। আইসিসি ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় আইনগত ভিত্তিহীন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মিয়ানমার জোর দিয়ে বলছে যে তারা কাউকেই দেশছাড়া করেনি।

মিয়ানমার তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, আইসিসির রোম সংবিধির পক্ষ না হওয়ায় আদালতের আদেশের প্রতি সম্মান জানাতে মিয়ানমার বাধ্য নয়। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে যাঁরা আইসিসিতে পর্যবেক্ষণ জমা দিয়েছেন তাঁদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য যাচাই করা হয়নি।

মিয়ানমার আরো বলেছে, আইসিসি আবেগপ্রবণ হয়ে এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে অভিযোগ হিসেবে আদালতে তুলে ধরা হয়েছে এবং এগুলোর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় তার বিভিন্ন প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেছে।



মন্তব্য