kalerkantho


বাসচাপায় মীম-রাজীব হত্যা

জাবালে নূরের মালিক চালকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জাবালে নূরের মালিক চালকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

রাজধানীর শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপা দিয়ে হত্যা এবং কয়েকজনকে আহত করার ঘটনায় জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের মালিক, চালক ও হেলপারদের ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক কাজী শরিফুল ইসলাম।

আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) এসআই আসাদুজ্জামান সূত্রে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযুক্তরা হলেন দুই বাসের মালিক শাহাদৎ হোসেন আকন্দ ও জাহাঙ্গীর আলম, দুই বাসচালক মাসুম বিল্লাহ ও জোবায়ের সুমন এবং দুই হেলপার এনায়েত হোসেন ও কাজী আসাদ। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য একটি বাসের চালক মো. সোহাগ আলী ও হেলপার মো. রিপন হোসেনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে একটি বাসের মালিক জাহাঙ্গীর আলম ও একটি বাসের হেলপার কাজী আসাদ পলাতক। তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিসহ তাঁদের মালামাল ক্রোকের আবেদন জানিয়েছেন।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২৭৯ ধারা (বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো), ৩২৩ ধারা (আঘাত), ৩২৫ (গুরুতর জখম) ও ৩০৪ ধারায় (খুনের উদ্দেশ্য ছিল না; কিন্তু যে কাজ করলে মানুষ হত্যা সংঘটিত হয় এমন কাজ করা) অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে ৩০৪ ধারায়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৯২৯৭ বাসটির মালিক মো. শাহাদৎ হোসেন। ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৭৬৫৭ বাসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম। বাসের চালক ও হেলপার নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র বাসের মালিকদের। এই মামলার ঘটনার ক্ষেত্রে বাস মালিক শাহাদৎ ও জাহাঙ্গীর দুজনই ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা না করেই চালকদের নিয়োগ দেন। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী দুই চালকই—মাসুম বিল্লাহ ও জোবায়ের সুমন বাস চালানোর অনুপযুক্ত। তাঁদের নিয়োগ দেওয়ার কারণে, চালক ও হেলপারদের যোগসাজশে বাসে বেশি যাত্রী ওঠালে বেশি টাকা পাওয়া যাবে—এই লোভে যাত্রীদের কথা না শুনে, তাদের নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা না করে নিজের ও মালিকের স্বার্থের জন্য বাসে ওঠার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ওপর বাস তুলে দেওয়া হয়। এ কারণে দুজন শিক্ষার্থী নিহত এবং ১১ জন আহত হয়। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, রেষারেষি করতে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর বাস উঠিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রত্যেকেই দায়ী।

চার্জশিটে আরো বলা হয়, চালক মাসুম ও জোবায়েরের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে এবং তা পর্যালোচনায় সঠিক পাওয়া গেছে। তবে দুজনের লাইসেন্সই হালকা শ্রেণির (কার, জিপ ও মাইক্রোবাস) মোটরযান চালানোর জন্য অনুমোদিত। ৪১ আসনের বাস চালানোর যোগ্য তাঁরা নন। তবে বাস তিনটির যান্ত্রিক কোনো ত্রুটি ছিল না।

চার্জশিটে আরো বলা হয়, পাল্লাপাল্লি দিয়ে বাস চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানোর আগে তাঁরা কয়েকবার ওভারটেকিং করেন। বাসের যাত্রীরা সাবধানে বাস চালাতে অনুরোধ করে। কিন্তু যাত্রীদের কথায় তাঁরা কান দেননি। ফলে জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভার (কালশী ফ্লাইওভার) পার হয়েই সেখানে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের ওপর বাস তুলে দেওয়া হয়। শাহাদৎ হোসেন যে গাড়ির মালিক ওই গাড়ির চাপে শিক্ষার্থীরা আহত হয় ও দুজন মারা যায়। তবে অন্য গাড়িটিও এ দুর্ঘটনার জন্য সমানভাবে দায়ী। চার্জশিটে আরো বলা হয়, বাসের মালিক শাহাদৎ, চালক মাসুম বিল্লাহ ও আরেক চালক জোবায়ের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে দোষ স্বীকার করেছেন।

তবে অন্য একটি বাস ঢাকা মেট্রো-ব-৭৫৮০ ঘটনার কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে এসেছিল বলে তদন্তে জানা যায়। ওই বাসের চালক সোহাগ আলী ও হেলপারের বিরুদ্ধে হত্যা বা কাউকে আহত করার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয় চার্জশিটে।

গত ২৯ জুলাই দুপুরে ওই ঘটনায় এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল করিম রাজীব নিহত হয়। ওই দিনই নিহত মীমের বাবা মো. জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। থানার কর্তৃপক্ষ প্রথমে দণ্ডবিধির ২৭৯ (বেপরোয়া গাড়ি চালানো) ও ৩০৪ (খ) দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করে।  কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায় বাস দুটির চালক-হেলপাররা ইচ্ছাকৃত ও বেপরোয়াভাবে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আঘাত করেন। এ কারণে তদন্ত কর্মকর্তা ৩০৪ ধারা সংযোজন করার আবেদন করেন গত ১ আগস্ট। আদালত ওই ধারা সংযোজনের আবেদন মঞ্জুর করেন। অভিযোগপত্র এই ধারায় দেওয়া হয়েছে।

মামলায় মোট ৪১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এর মধ্যে নিহতদের স্বজন, আহত ভিকটিম ও তাদের স্বজন, বিআরটিএর কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট ও চিকিৎসক রয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীও রয়েছে।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করার পর পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে। পরে তাঁদের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ হবে। এর পরও তাঁরা আত্মসমর্পণ না করলে বা গ্রেপ্তার না হলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হবে। এরপর মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হবে। দায়রা আদালতে মামলাটির বিচার হবে।

গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের জানান, ছয়জনের নামে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় আটজনকে আসামি করে মামলা দায়ের হলেও চার্জশিটে দুজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁরা তৃতীয় বাসের চালক ও হেলপার। অর্থাৎ সেদিন ঘটনার কিছুক্ষণ পর মক্কা পরিবহনের বাসটি আসে। তদন্তে জানা গেছে, ওই বাসটি ঘটনার জন্য দায়ী নয়।

চার্জশিটে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারা আনা হলো না কেন জানতে চাইলে আবদুল বাতেন বলেন, ‘ঘটনা তদন্ত করে ৩০২ ধারার অপরাধ পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি ৩০৪ ধারার অপরাধ। এই ধারা মানে যাবজ্জীবনের সাজা। ৩০২ ধারার সাজা মৃত্যুদণ্ড। ৩০২ ধারার জন্য তদন্তে যে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো আসা দরকার তা পাওয়া যায়নি। পূর্বপরিকল্পনা এবং নিশ্চিত মৃত্যু অনুযায়ী হত্যার পরিকল্পনা থাকতে হতো; কিন্তু তদন্তে তা পাওয়া যায়নি। তিনি যোগ করেন, বেপরোয়াভাবে গাড়ি না চালিয়ে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই ঘটনা ঘটত, তবে অভিযোগ ৩০৪-এর খ ধারায় পড়ত। সেটি হলে সাজা তিন বছর হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। যেহেতু ইচ্ছাকৃত করেছে, তাই সবার বিরুদ্ধেই ৩০৪ ধারায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এতে যাবজ্জীবন সাজা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



মন্তব্য