kalerkantho


সড়কমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক

সড়কে মৃত্যুর সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর চান বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সড়কে মৃত্যুর সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর চান বিশেষজ্ঞরা

সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের

সরকারের শেষ সংসদ অধিবেশনে সড়ক পরিবহন আইন পাস হতে যাচ্ছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর বসছে জাতীয় সংসদের ২২তম অধিবেশন। এটাই বর্তমান সরকারের শেষ অধিবেশন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময়সভার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও  সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

প্রস্তাবিত এই আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালনায় কারো মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর প্রস্তাব করা হয়। গতকাল মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষজ্ঞরা এই শাস্তি ১০ বছর রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। জবাবে সড়কমন্ত্রী বলেন, ‘সভায় নিরাপদ সড়ক গড়তে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কোন কোন কর্মকর্তার জন্য পুরো বাস্তবায়ন হচ্ছে না তা এক সপ্তাহের মধ্যে পর্যালোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর নগর পরিবহনের বাসগুলোয় হাইড্রোলিক দরজা সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।’

গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় দুজন শিক্ষার্থীর প্রাণহানির পর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন দানা বাঁধে। ওই তুমুল আন্দোলনের মধ্যে গত ৬ আগস্ট ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে। গত বছরের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রস্তাবিত আইন নীতিগত অনুমোদন পায়।

গতকাল সভায় নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রস্তাবিত এই আইনের কিছু অংশের সংশোধনের প্রস্তাব করেন। তিনি প্রস্তাবিত আইনে এই শাস্তি ১০ বছর রাখার প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া বিশিষ্ট কলামিস্ট ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদও এ আইনের কিছু অংশের সংশোধনের প্রস্তাব করেন। 

বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবের পর সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সংসদে উপস্থাপনের পর আইনটি চলে যাবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান আপনাদের ডাকবেন, পরামর্শ শুনবেন। এখনো একেবারে এটাই ফাইনাল নয়। কিছু কিছু জায়গায় সংযোজন, সংশোধনের সুযোগ আছে। আপনারা সেখানে পরামর্শ দেবেন।’ সড়কমন্ত্রী বলেন, ‘সেখানে জাতীয় পার্টি আছে, অন্য দলও আছে। সংসদে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এটা নিয়ে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরাও চাচ্ছি, দেশের মানুষের কাছে আইনটি গ্রহণযোগ্য হোক। এটি যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, বাস্তবানুগ না হয় তাহলে তো আইন সুফল দেবে না। সেই সুযোগ সামনে আছে, আপনারা যাবেন, কথা বলবেন।’  ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সামনে সরকারের শেষ অধিবেশন। আশা করছি, এই অধিবেশনেই আইনটি পাস হবে। আমি অপটিমিস্টিক (আশাবাদী)।’

সড়কমন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনের পর এক বছরের বেশি সময় পর সড়ক পরিবহন আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। কিশোর-কিশোরীরা যারা নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করেছিল, আমি তাদের স্যালুট করি। তারা আন্দোলনটা করেছিল বলে আজ এই আইনটা যেভাবেই হোক আলোর মুখ দেখছে। আর বেশি কিছু বললাম না।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনই হবে এই সরকারের শেষ অধিবেশন। এরপর আর কোনো অধিবেশন নেই। তবে সংসদ ভাঙবে না। কিন্তু অধিবেশনও হবে না। সংসদ সদস্যদের ক্ষমতাও আর থাকবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সভায় বক্তব্য দেন বিশেষজ্ঞরা। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা আনতে ও নিরাপদ সড়ক গড়তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন নির্দেশনা এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের কারা বাধা হয়ে আছেন তা দেখতে হবে। কারণ প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেও তার কেন বাস্তবায়ন হবে না। গত দুই বছরে প্রধানমন্ত্রী অনেক নির্দেশনা দিয়েছেন।

‘হাল ছাড়িনি’ : দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি  চেষ্টা করে যাচ্ছি, হাল ছাড়িনি। দুই দিন আগে দেখলাম ১০ জন মারা গেছেন, ১০ জনই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এটা ভয়ংকর, মূর্তিমান আতঙ্ক।’ বিভিন্ন স্থানে ছোট যানের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞরা সভায় জানান। এ বিষয়ে সড়কমন্ত্রী বলেন, ‘ইজি বাইক কারখানা আছে কয়েক শ, উৎসমুখ বন্ধ করতে পারিনি। আমি মাঝে মাঝে বলি, আমাদের পলিটিকসটা যদি ঠিক হতো তাহলে বাংলাদেশের সব ঠিক হতো। এখানে আমাদের মূল সমস্যা।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডিভাইডার দিয়ে কী হবে! উল্টা দিকে গ্যাপ থাকলে মা তার বাচ্চা নিয়ে লাফ দেয়। কেউ কথা শোনে না। ঢাকা সিটিতে কেউ নিয়ম-কানুন মানে না। রেকলেস চালকের সঙ্গে রেকলেস পথচারীরাও দায়ী। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে মেট্রো রেল, পদ্মা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করে লাভ হবে না।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সড়ক পরিবহন আইন পুনর্বিবেচনা করে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গত দুই বছরে প্রধানমন্ত্রীর যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা কেন বাস্তবায়িত হয়নি, তা পর্যালোচনা করতে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে তা করা যায়।

৩০৪ ধারার ব্যবহার দাবি : ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া চালক দুর্ঘটনা ঘটালে ৩০২ ধারার মামলার বিধান রাখতে হবে। তিনি বলেন, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সের শাস্তি দুই বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। কিন্তু যার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই তার ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। ধরা পড়লে তো ফেক লাইসেন্সধারী বলবে তার লাইসেন্স নেই। দুটি ক্ষেত্রেই দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখতে হবে।

বাস কম্পানি করতে হবে : বাংলাদেশ বাস-ট্রক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, “ঢাকা শহরে গণপরিবহনে, বিশেষ করে বাসের কয়েকটি কম্পানি করতে হবে। ঢাকায় বৈধ পার্কিং স্থান নেই। আমার চালকরা বলে, ‘গাড়ি কোথায় রাখব?’ এর জবাব নেই আমাদের কাছে। গণপরিবহনে হাইড্রলিক ডোর লাগাতে হবে। বিদেশে এটা আছে। তাতে বেশি টাকা খরচ হবে না।”



মন্তব্য