kalerkantho


অনেক প্রাপ্তির এক জয়

সনৎ বাবলা   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অনেক প্রাপ্তির এক জয়

স্বপ্নিল সূচনা। ভুটানের বিপক্ষে গোল উৎসব তপু বর্মণ-মাহবুবদের। ছবি : মীর ফরিদ

ভুটানে সর্বশান্ত হয়েছিল বাংলাদেশের ফুটবল। প্রায় দুই বছর পর সেই ভুটানই হয়েছে শুভারম্ভেও সূত্রধর। তাদের ২-০ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ শুভ সূচনা করেছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। তপু-সুফিলের দুটি গোলই এই ফুটবলকে রাঙিয়েছে নতুন করে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে রচিত সেই ‘ফুটবল ট্র্যাজেডিতে’ খাদে পড়ে গিয়েছিল লাল-সবুজের ফুটবল। থিম্পুতে সেই হারের পর ১৭ মাস মাঠে নামেনি জাতীয় দল। নিন্দা-মন্দ হয়েছে চারদিকে।  সেই দিন ভুলিয়ে আবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে হয়েছে নতুন দিনের শুরু।   

বাংলাদেশ ফুটবলের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। এশিয়ান গেমসের মাতাল হাওয়ায় লাল-সবুজের গায়ে লেগেছে নতুন রং। তাতে দেশের ফুটবল চিরকালীন কিছু দুর্ভোগ ঘুচিয়ে নবরূপে হাজির। কেটে গেছে যখন-তখন গোল খাওয়ার বদ-অভ্যাস। শেষ সময়ে গোল খেয়ে মাথা হেঁট করে ফেরার দিনও বুঝি ফুরিয়েছে। তার ইঙ্গিত ছিল গেমস ফুটবলে। কালকের ম্যাচে নতুন দেখা গেছে আরেকটি জিনিস। শুরুর গোলে শেষ করে দেওয়া। শুরুতেই গোল করে বাংলাদেশ ডানা ভেঙে দিয়েছে ভুটানের। দুই অর্ধের শুরুতে দুই গোল করে তারা দেখিয়েছে নতুন ব্র্যান্ডের ফুটবল। এই নতুনে দিন বদলের গল্প আছে, জাগরণের সুযোগ আছে। সত্যি বললে, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দল এমন রোমাঞ্চ নিয়ে হাজির হয়নি কখনো।

সচরাচর বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এত দর্শক দেখার সৌভাগ্য হয় না ফুটবলের। হালের চেনা ছবি খাঁ খাঁ গ্যালারি। তিন বছর আগে এত দর্শক হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সেই ম্যাচ বাংলাদেশ হারলেও মানুষ এসেছিল খেলা দেখতে। পুরো স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরে উঠেছিল। গতকাল সে রকম না হলেও এশিয়ান গেমসের সেই মাতাল হাওয়া লেগেছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামেও। প্রায় ১২ হাজার দর্শক-সমর্থক মাঠে আসে লাল-সবুজের তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করতে। খেলা শুরু হতেই গোল আর স্টেডিয়াম হুল্লোড় তুলে স্বাগত জানায় তপু বর্মনের পেনাল্টি গোলের লিডকে। একদম প্রথম অ্যাটাকেই গোলের হাওয়া। ভুটান কর্নারের বিনিময়ে আক্রমণটা আপাত সামাল দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ওয়ালি ফয়সালের কর্নার কিকে ভুটানি ডিফেন্ডার ফাউল করে বসেন সাদকে। থাই রেফারি পেনাল্টির বাঁশিতে স্টেডিয়ামে শুরু হয় গোলের অনুরণন। সঙ্গে শঙ্কাও! তপু বর্মনের শটে না বিষাদের রাগিনী বেজে ওঠে। না, সেটা হয়নি। তপু বাংলাদেশের ‘রামোস’ হয়ে ভুটানের জালে বল পৌঁছে দিয়ে আনন্দ-সাগরে ভাসিয়ে দেন সবাইকে। যে দলের সমস্যা স্ট্রাইকিংয়ে সেই তারাই কি না ম্যাচ শুরু করে লিড নিয়ে। এই গোল বাড়িয়ে দেয় আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্ন। সেটা আরো জোরালো হতে পারত ৭ মিনিটে। মাশুকের মাঝমাঠ থেকে বাড়ানো থ্রু বলে গোলমুখ খুলে ফেলেছিলেন মাহবুবুর রহমান সুফিল। বাঁ দিক ধরে গোলের দুয়ারে পৌঁছেও ব্যবধান দ্বিগুণ করতে পারেননি। আগুয়ান ভুটানি গোলরক্ষক দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ঠেকিয়ে দেন তাঁর শট।

সেটা না হওয়ায় ভয় যেন তাড়া করে সব সময়। ভুটানের ম্যাচে ফেরার ভয়। সেই লিড বাঁচাতে বাংলাদেশ যেন একটু রক্ষণাত্মক হয়ে খেলতে থাকে। আক্রমণ বাদ দিয়ে সবাই নিচে নেমে আসায় সহজ হয়ে যায় ভুটানের খেলা। ১৫ মিনিটে এমন চাপ দেয় তারা গোল শোধ হয় যখন-তখন। চাপে ডিফেন্ডার টুটুল মারাত্মক এক ভুল করে বসেন। কী বুঝে যেন তিনি বল ছেড়ে দিয়েছিলেন গোলরক্ষক শহীদুলের জন্য! এই সুযোগে চেনচো ফাঁকায় পাওয়া বল পোস্টে রাখলেই ম্যাচে ফেরে ভুটান। ভুটানি ‘রোনালদো’ অবিশ্বাস্যভাবে মারেন বাইরে। ২৭ মিনিটে সেই সুযোগ নষ্টের দুই মিনিট বাদে আবার চেনচোর পায়ে সর্বনাশের শঙ্কা। ডান-বাম করে সেবারও অতি দুর্বল শটে বল তুলে দেন শহীদুলের হাতে, সুবাদে বহাল থাকে বাংলাদেশের লিড।

ওই ১৫ মিনিট বাদ দিলে আর তেমন শঙ্কা নেই। বাকিটা অনেকখানি সুযোগ নষ্টের আফসোসে ভরা। বিশেষ করে সুফিল-বিপলুর দুর্দান্ত এক মুভ জালে না যাওয়ায়। ৩৫ মিনিটে বাঁ দিক থেকে সুফিল দারুণভাবে বলটি নিয়ে ওঠেন এবং ঠেলেন বিপলুর কাছে। এই তরুণের বাঁ পায়ের শট ঠেকিয়ে দেন ভুটানি গোলরক্ষক। পরের মিনিটেই আবার ওয়ালির কর্নারে ফাহাদের হেড বাতাস লাগিয়ে যায় পোস্টে। এমন সব সুযোগ মিস শেষভাগে সর্বনাশই ডেকে আনতে পারে। কিন্তু এই দলের পায়ে ফুটবল যে নতুন এক ব্র্যান্ড হয়েছে। শুরুর গোলেই শেষ হওয়ার নতুন ম্যাজিক শুরু করেছে। সেই ধারায় বিরতির পর মাঠে নামতেই আবার গোলের শোরগোল। ৪৭ মিনিটে মাহবুবুর রহমান সুফিলের ডান পায়ের দুর্দান্ত ভলিতে বাংলাদেশের জয়ের ছবি পেয়ে যায় মানুষ। এই সুখ স্মৃতি নিয়েই স্বাগতিক দর্শকরা মাঠ ছাড়ে অনেক দিন পর।      

বাংলাদেশ দল : শহীদুল, ওয়ালি, তপু, টুটুল হোসেন, বিশ্বনাথ, জামাল, আতিক, বিপুল, মাশুক (ইমন বাবু), সাদ (ফয়সাল, মামুনুল) ও সুফিল।



মন্তব্য