kalerkantho


পূর্বাচলে স্টেডিয়ামের জমি দখল এমপি গাজীর

♦ ‘নীলা’র নামে মার্কেট ব্যবসা
♦ রাজউক ও পূর্ত মন্ত্রণালয় নির্বিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পূর্বাচলে স্টেডিয়ামের জমি দখল এমপি গাজীর

রাজধানীর পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় মার্কেটের নামে স্টেডিয়ামের হাজার কোটি টাকা মূল্যের জমি দখল করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগদলীয় এমপি (নারায়ণগঞ্জ-১) গাজী গোলাম দস্তগীর। মার্কেটের নাম ‘নীলা মার্কেট’। প্রকাশ্যে মার্কেটের সর্বেসর্বা রূপগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌসী আলম নীলা। এলাকাবাসী বলছে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রক মানে আসল দখলদার হলেন এমপি। এজাতীয় দখলের পরও নীরব রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এই সুযোগে গোটা এলাকা এখন এমপি এবং তাঁর সমর্থক দখলবাজদের নিয়ন্ত্রণে। তাঁর বেআইনি কর্মকাণ্ডের ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত অকার্যকর এবং নিজ দলীয় নেতাকর্মীরাও কোণঠাসা।

এলাকাবাসীর কাছে নীলা মার্কেট ‘গাজীর লোকদের সাম্রাজ্য’ নামে পরিচিত। এ সাম্রাজ্যে রয়েছে গাড়ি পার্কিং পয়েন্ট, কয়েক শ দোকানপাট, রেন্ট-এ-কারের টার্মিনাল, হোটেল-রেস্তোরাঁ, মাছবাজার, মিষ্টির কারখানা, স্থায়ী-অস্থায়ী বাজারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। সরকারি সিদ্ধান্তে পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আমলা, বিচারপতিসহ বিভিন্ন মহলের অনেকে প্লট পেয়েছেন। অনাগত প্রজন্মের জন্য সেই প্রকল্পে বিশাল জায়গা বরাদ্দ রাখা হয় স্টেডিয়ামের জন্য। কিন্তু রূপগঞ্জের জায়গাজমি দখলের রেকর্ড স্থাপনকারী এমপির নজর থেকে সেই স্টেডিয়ামের জায়গাটিও রক্ষা পায়নি। অনেক মন্ত্রী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি বিষয়টি জানলেও এমপি গাজীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

গুঞ্জন আছে—মন্ত্রীরাও জানেন, রূপগঞ্জে কেউ জায়গা কিনতে বা বিক্রি করতে চাইলে বা বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করতে চাইলে গাজী এমপির ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্ভব নয়। একাধিক মন্ত্রীর দপ্তরে এ নিয়ে মীমাংসা বৈঠকও হয়েছে অনেক সময়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নীলা মার্কেটে কয়েক শ দোকানঘর। ৫০০ দোকানের আলাদা কাঁচাবাজারও গড়ে উঠেছে সেখানে। এসব দোকানঘর থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিদিন বিদ্যুৎ, পানি ও পরিচ্ছন্নতার দোহাই দিয়ে প্রতি দোকান থেকে আকারভেদে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে চাঁদাবাজচক্র। মার্কেট ঘিরে ভোলানাথপুরসহ আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে মাদকের আস্তানা, যেখানে পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক। নীলা মার্কেটের সামনেই একটি কবরস্থান। কবরস্থানের ভেতরেই মাদকের মজুদ গড়ে হরদম কেনাবেচা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি দোকানঘরের পজেশন বিক্রি করা হয়েছে। একেকটি পজেশনের মূল্য এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এসব টাকা সংগ্রহ করেন ফটিক আলম।

যেভাবে গড়ে ওঠে : পূর্বাচল আবাসনের ভোলানাথপুর এলাকায় বিশ্বমানের স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে রাজউক এ জায়গা বরাদ্দ দেয়। এ জমি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ দিলেও তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনো বুঝিয়ে দেয়নি রাজউক। এই সুযোগটি নিয়েছে প্রভাবশালীরা। এমপি গোলাম দস্তগীরের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং রূপগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌসী আলম নীলার তত্ত্বাবধানে পাঁচ বছর আগে সেখানে গড়ে তোলা হয় ক্লাব ঘর। এর নাম দেওয়া হয় ‘আওয়ামী লীগ ক্লাব’। নীলার স্বামী ফটিক আলম ও দেবর আনোয়ার হোসেন এই ক্লাব পরিচালনা করেন। তাঁদের নেতৃত্বেই লীগ ক্লাব ঘেঁষে একের পর এক দোকানপাট গড়ে ওঠে, চলতে থাকে পজেশন আকারে জায়গা কেনাবেচা। দেখতে দেখতেই সেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ দোকানের বিরাট বাজার জমে উঠেছে। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের নামেই নাম দেওয়া হয়েছে ‘নীলা মার্কেট’।

সেখানে একেকটি দোকানের পজেশন মূল্য বাবদ তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা এককালীন আদায়ের পাশাপাশি ভাড়ার নামে দোকানপ্রতি দৈনিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে রাজউক সূত্র বলেছে, সেখানে অন্তত চার দফা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। উচ্ছেদ শেষ হলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আবারও সেখানে দোকানপাট নির্মিত হয়। এর পরও একাধিকবার উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েও পুলিশের সহায়তার অভাবে সফল করা যায়নি।

পূর্বাচল উপশহর গড়ে ওঠার লক্ষ্যে ভোলানাথপুরসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকার রাস্তাঘাট সুন্দর করে নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০০ ফুট সড়ক অসংখ্য মানুষের বিনোদনস্থল হয়ে উঠেছে। তাদের টার্গেট করেই নীলা মার্কেট ও আশপাশ এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে মাদকের আস্তানা। বসানো হয়েছে জুয়ার আসর। নারীকেন্দ্রিক নানা রকম অপরাধ আখড়াও জমে উঠেছে সেখানে। র‌্যাব, পুলিশসহ প্রশাসনের চোখের সামনে জবরদখলসহ অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, নীলা মার্কেটে মাদকের রমরমা বাণিজ্য চালাচ্ছেন আনোয়ার হোসেন। তাঁর হয়ে কাজ করে সালাউদ্দিন, বাকির, রাসেল, নুরুজ্জামান, রাকিব, মোমেন, বাসিত, আবুসহ ১০-১২ জনের একটি গ্রুপ।

এসব ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ফেরদৌসী আলম নীলা বলেন, ‘এমপি সাহেবের নির্দেশে স্টেডিয়ামের জায়গায় এ অস্থায়ী বাজার বসানো হয়েছে। আবাসন প্রকল্পের কারণে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন তাদের উৎপাদিত ফল-ফসলাদি এ বাজারে বেচাকেনা করে জীবিকা নির্বাহ করে।’ বাজার ঘিরে কোনো রকম চাঁদাবাজি চালানোর কথা তিনি অস্বীকার করেন।

ক্ষুব্ধ নেতারা : উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও এই দখল-সন্ত্রাস থেকে মুক্তি চান। গতকাল মঙ্গলবার রূপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, পূর্বাচল প্রকল্পের স্টেডিয়াম জবরদখল করে নীলা মার্কেট বসানোর অপকর্মের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বা এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো নেতাকর্মী জড়িত নেই। এটা গাজী এমপি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ব্যক্তিগত লুটপাটের ব্যবস্থাপনা ছাড়া কিছু নয়। সেখানে জবরদখলের মার্কেট বানানোর নামে মাদক, জুয়া, অসামাজিক কার্যকলাপের বিশাল আখড়া গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি অবিলম্বে নীলা মার্কেট উচ্ছেদ করে নির্ধারিত স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন।

রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি খন্দকার আবুল বাসার টুকু বলেন, এমপির নেপথ্য ইন্ধনে তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহযোগী নীলার নামে জবরদখলবাজির এ মার্কেট তৈরি হয়েছে। এমপি, তাঁর পিএস, এপিএস আর নীলা এ মার্কেট গড়ার নামে সীমাহীন চাঁদাবাজি ও লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীর বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হাফিজুর রহমান সজীব বলেন, এমপি গাজী গোলাম দস্তগীর তাঁর নিজস্ব বলয়ের গুটিকয় লোক নিয়ে আওয়ামী লীগের বিকল্প ‘গাজী লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে রূপগঞ্জজুড়েই জবরদখল, লুটপাট ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায়ই তিনি গড়ে তুলেছেন অবৈধ নীলা মার্কেট। নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য মিজানুর রহমান মিজান, উপজেলা যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক শায়লা তাহসীন সিথী, দাউদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হোসেন ভূইয়া রানুসহ নেতারা অবিলম্বে রাজউকের পূর্বাচলে গড়ে তোলা অবৈধ নীলা মার্কেট উচ্ছেদ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী স্টেডিয়াম নির্মাণের জোর দাবি জানান।



মন্তব্য