kalerkantho


হরিলুটের ‘চমৎকার’ আয়োজন

ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুই সরকারি হাসপাতালে পরিদর্শন

তৌফিক মারুফ   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হরিলুটের ‘চমৎকার’ আয়োজন

রাজধানীর শেরেবাংলানগরে জাতীয় কিডনি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কয়েক বছর আগে স্থাপিত হয় বিশেষায়িত ডায়ালিসিস সেন্টার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালক তাঁর রাজধানীর মহাখালী দপ্তর থেকে এ দুটি সেন্টার তিন বছরের জন্য পরিদর্শনের যে কর্মসূচি ও সম্মানী ভাতা ঠিক করেছেন তা এই রকম—শেরেবাংলানগরে কিডনি হাসপাতালে গিয়ে প্রতিবার পরিদর্শনের জন্য তিনি নেবেন ১৩ হাজার টাকা। তিন বছরে মোট ৩৮ বার পরিদর্শনে তিনি নেবেন চার লাখ ৯৪ হাজার টাকা সম্মানী। একইভাবে চট্টগ্রামে তিন বছরে পরিদর্শন বাবদ নেবেন চার লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ফলে সব মিলিয়ে তিন বছরে তিনি এই পরিদর্শন কার্যক্রম থেকে শুধু সম্মানী বা ফি (যাতায়াত বা অন্য খরচ ছাড়াই) পাবেন ৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে (পিপিপি) স্থাপিত ওই দুটি সেন্টার তথা প্রকল্পের চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে নিজেই নিজের জন্য এই ভাতার পরিমাণ ঠিক করে আদেশপত্রে সই করেছেন পরিচালক অধ্যাপক ড. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি তাঁর অধীন একজন উপরিচালকের জন্য ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন প্রতিবার পরিদর্শনে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ উপপরিচালক তিন বছরে পাবেন ছয় লাখ টাকা।

জাহাঙ্গীর হোসেন আরো কয়েকজন চিকিৎসককেও ভালো রকম সম্মানী পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই চিকিৎসকদের চারজন ওই দুটি হাসপাতালেই কর্মরত। তাঁরা নিজ কক্ষ থেকেই ভবনের আরেক কক্ষে ওই সেন্টারে গিয়ে প্রতিবার ১০ হাজার টাকা হিসাবে তিন বছরে ৩৩ বার পরিদর্শন বাবদ পাবেন তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা করে। পাশের একটি হাসপাতাল থেকে আরেকজন চিকিৎসক আসবেন ওই পরিদর্শন কার্যক্রমে। তিনিও পাবেন প্রতিবারে ১০ হাজার টাকা করে। আরো কয়েকজনের মিলিয়ে তিন বছরে মোট পরিদর্শন ফি বাবদ ৩৭ লাখ ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে স্থাপিত ওই দুটি সেন্টার তথা প্রকল্পের চুক্তির শর্ত অনুসারে সেন্টারগুলো পরিদর্শন করবে একটি ‘ইনডিপেনডেন্ট প্যানেল’। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন পরিচালক বা অন্য কোনো কর্মকর্তা এই প্যানেলের সদস্য হতে পারবেন না। আলাদা সম্মানী ভোগ করারও তাঁদের সুযোগ নেই। এমনিতেই এ প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে থাকা ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো সেন্টারে কর্মরত চিকিৎসক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে না পারায় মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তার ওপর নতুন এই ‘সম্মানী কাণ্ডের’ মুখে এখন পুরো প্রকল্পকেই আরো জটিলতায় পড়তে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন পরিদর্শন কার্যক্রমের জন্য দুটি ‘ইনডিপেনডেন্ট প্যানেল’ তথা কমিটি গঠন করেছেন। দুটি প্যানেলেরই চেয়ারম্যান হয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন দপ্তরের এক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) নিজ ক্ষমতাবলে যেকোনো সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনে যেতে পারেন। কিন্তু তিনি আলদাভাবে তৈরি কমিটির সদস্য থাকতে পারেন না। এসব বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ঘটনা দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত অনুসারে দেখা যায়, সরকারের পক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ভারতীয় স্যানডোর ডায়ালিসিস সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি অনুসারে স্থাপিত বিশেষায়িত ডায়ালিসিস সেন্টার পরিদর্শনের জন্য দুটি ইনডিপেনডেন্ট প্যানেল বা কমিটি থাকবে; যার সদস্যদের জন্য বিশেষ হারে সম্মানীর ব্যবস্থাও থাকবে। কিন্তু কমিটিতে মূল চুক্তি স্বাক্ষরকারী দুই কর্তৃপক্ষের কেউ থাকতে পারবে না। ওই শর্ত মেনে ২০১৫ সালের ২৫ মে তিন বছরের জন্য ইনভেসকো গ্লোবাল নামের একটি কম্পানির সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তির মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল; যার মেয়াদ চলতি বছরের ২৫ মে শেষ হয়ে যায়। মেয়াদ শেষের আগে সেদিকে কোনো খেয়াল না রাখায় দুই মাস কোনো কমিটি ছাড়াই চলে কার্যক্রম। এর একপর্যায়ে গত ২৬ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন নিজ স্বাক্ষরে ইনভেসকো গ্লোবালের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেন। একই দিন তিনি নিজ স্বাক্ষরে পৃথক এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট দুটি (মোট ১২ সদস্য) কমিটি গঠনের কথা প্রকাশ করেন। যদিও ভূমিকার এক অংশে পাঁচ সদস্যের কমিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জাহাঙ্গীর হোসেন ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হেমো ডায়ালিসিস কার্যক্রম তদারকি ও সুষ্ঠু মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে এবং আগের কমিটির মেয়াদ ২৫ মে ২০১৮ তারিখ উত্তীর্ণ হওয়ায় নতুন ইনডিপেনডেন্ট প্যানেল কমিটি গঠন করা হলো। প্রথম প্যানেলের (নিকডু, ঢাকা) চেয়ারপারসন তিনি নিজে (পরিচালক, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলেঅ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা)। সদস্য রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, গণপূর্ত বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (হাসপাতাল-১)।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের একই প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শনে গঠিত ইনডিপেনডেন্ট প্যানেলের চেয়ারপারসনও তিনি নিজে। সদস্যরা হচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন, সার্জারি  ও নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (তিনজন), চট্টগ্রামের গণপূর্ত বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (হাসপাতাল-১)।

ওই দিনই পৃথক আরেক নোটিশ ইস্যু করেন অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন। যেখানে তিনি নিজেরসহ ওই দুই কমিটির প্রতি সদস্যের জন্য পরিদর্শন ফি নির্ধারণ করেন। তাতে তাঁর অধীন একজন উপপরিচালকের মতোই প্রতিবার পরিদর্শনের জন্য ১০ হাজার টাকা করে তিন বছরে মোট ছয় লাখ টাকা সম্মানী ভাতা ঠিক করে দেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রতিনিধিদের। গণপূর্ত বিভাগের সহকারী প্রকৌশলীরা পাবেন ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিবার পাঁচ হাজার টাকা করে তিন বছরে ৫৪টি পরিদর্শনের মাধ্যমে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তিন বছরে পরিদর্শন ফি বাবদ ৩৭ লাখ ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ড. জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে যে কমিটি করা হয়েছিল সেই কমিটি কোনো কাজ করেনি। আবার এর মধ্যেই মেয়াদ চলে গেছে, তাই পুরনো কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিধি বা চুক্তির বাইরে কিছুই করা হয়নি। আর আমি নিজে স্বাক্ষর করলেও ওপরের কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারেই সব করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আসলে আমার বিরুদ্ধে একটি চক্র উঠে পড়ে লেগেছে। বিশেষ করে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে আমি কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় অনেকেই আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নানা ধরনের অভিযোগ করছে।’  তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, সবেমাত্র কমিটি করা হয়েছে। এখনো তো কেউ টাকা নেয়নি। আর পরিদর্শনে না গেলে তো টাকাও কেউ পাবে না। এর আগের কমিটিও পরিদর্শনে যায়নি বলে টাকা খরচ হয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে কিডনি ডায়ালিসিসের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান সরকারের শুরুর দিকেই সরকারি বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে নতুন ১১০টি ডায়ালিসিস মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৭০টি এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪০টি মেশিন স্থাপন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য খাতে পিপিপির আওতায় এটি প্রথম কোনো প্রকল্প। ২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক এবং ভারতের স্যান্ডর প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব সিন্ধি যৌথভাবে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ১০ বছর। প্রকল্পের আওতায় সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে জায়গা, ইউটিলিটি সুবিধা ও নেফ্রোলজিস্ট সরবরাহ করবে। আর বেসরকারি অংশীদারের পক্ষ থেকে ডিজাইন, যন্ত্রপাতি ক্রয়, স্থাপনসহ অর্থায়ন, অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এ ছাড়া বেসরকারি অংশীদার অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবলও নিয়োগ করবে।

প্রকল্পের আওতায় কিডনি বিকল রোগীরা ৪০০ টাকায় প্রতি সেশন ডায়ালিসিস করতে পারবে। ২০১৬ সালে প্রথম জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ভবনের নিচতলায় এ প্রকল্পের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া শুরু হয়। আর ওই সেবা কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্যই চুক্তির শর্ত অনুসারে আগেভাগেই বেসরকারি ইনভেসকো গ্লোবাল নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইনডিপেনডেন্ট প্যানেল গঠন করা হয়েছিল।

স্যান্ডোরের বাংলাদেশ কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন কমিটির নামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চুক্তির কয়েকটি ধারা লঙ্ঘন করেছে। এখানে আমরা একটি পক্ষ আর সরকারের পক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি পক্ষ। তাই স্বাধীন বা স্বতন্ত্র প্যানেলে আমাদের দুই পক্ষের কেউ থাকতে পারে না আর পরিদর্শনের নামে আর্থিক সুবিধাও নিতে পারে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ইনডিপেনডেন্ট প্যানেল না করলে পুরো বিষয়টিই অবৈধ হয়ে যাচ্ছে, যা নিয়ে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগটি আইনি ঝামেলার ঝুঁকিতে পড়বে।

তিনি দাবি করেছেন, চুক্তির শর্ত অনুসারে প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকে শুরু করে পুরো ১০ বছরে পরামর্শক ফি ও পরিদর্শন ফি সর্বসাকুল্যে মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।



মন্তব্য